Table of Contents
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) চলমান বিক্ষোভ দমনে পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘নির্মম’ শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলল ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে অন্তত ৪০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছেন বহু মানুষ। ঘটনার নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে ভারত।
শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “পাকিস্তানি প্রশাসন পিওকের শান্তিপূর্ণ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নির্মম শক্তি প্রয়োগ করে চলেছে।” তাঁর দাবি, এই দমন-পীড়নে ৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
জয়সওয়ালের অভিযোগ, পিওকের সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে কারচুপির অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আসলে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের অনাস্থার প্রতিফলন।
ভোট ঘিরেও বিতর্ক
পিওকের ৫৩ আসনের আইনসভায় ৪৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। বাকি আটটি আসন মহিলা, প্রযুক্তিবিদ এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত।
তিন দফায় ভোটগ্রহণ চলছে এবং ১০ আগস্ট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। ২৭ জুলাই প্রথম দফায় ১৩টি আসনের মধ্যে নয়টিতে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) জয়ী হয়েছে বলে সরকারি ভাবে জানানো হয়েছে। বাকি আসনগুলি পেয়েছে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে।
ভারতের বক্তব্য, এই নির্বাচন পিওকের উপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণকে বৈধতার মোড়ক দেওয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আড়াল করার চেষ্টা।
৩৮ দফা দাবিতে আন্দোলন
গত দু’মাস ধরে পিওকের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ চলছে। ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)-র নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান আপত্তি আইনসভায় অ-বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়ে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলির মাধ্যমে ইসলামাবাদ রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে এবং স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করে। তাঁদের দাবি, পাকিস্তানের কেন্দ্রে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, পিওকের নির্বাচনেও সেই দলের জয়ী হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
২০১১ সালে পিপিপি, ২০১৬ সালে পিএমএল-এন এবং ২০২১ সালে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই সুবিধা পেয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক নয়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, নাগরিক স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগও আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।
বিদ্যুৎ আছে, তবু অন্ধকারে পিওকে?
ভারতের অভিযোগ, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে ভর্তুকিযুক্ত গম, ওষুধ-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ নিয়েও ক্ষোভ তীব্র। মাংলা-সহ একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বহু গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও বাসিন্দাদের দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে বলেও দাবি আন্দোলনকারীদের।
তাঁদের ৩৮ দফা দাবিপত্রে আর্থিক দুর্নীতি এবং শাসকশ্রেণির বিশেষ সুবিধার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছে জেএএসি।
নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করলেও, এই সংখ্যার স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
ভোটের পর বন্ধ ইন্টারনেট
প্রথম দফার নির্বাচনের পর থেকেই পিওকের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রয়েছে বলে খবর। এর মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের অভিযোগ সামনে এসেছে।
জেএএসি-র দাবি, প্রথম দফার ভোটের সময় সংঘর্ষে তাদের অন্তত ১৪ জন কর্মী নিহত এবং ২০-র বেশি আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁদের ভারতের মতোই ‘শত্রু’ আখ্যা দিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করেন তিনি।
এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে জয়সওয়াল বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ‘শত্রু’ বলে অভিহিত করাই পিওকের সাধারণ মানুষের প্রতি পাকিস্তানের “সম্পূর্ণ অবজ্ঞা” প্রকাশ করে।
আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি
ভারতের দাবি, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে পিওকের বাসিন্দারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর কথিত হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন।
জয়সওয়াল বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসলামাবাদকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
নয়াদিল্লির বার্তা স্পষ্ট—পিওকে-র বিক্ষোভকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে দেখলে চলবে না; মানবাধিকার পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
তবে ভারতের তোলা অভিযোগগুলির পাশাপাশি পাকিস্তানি প্রশাসন ও বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়াই এখন পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।