বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নতুন পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে বড় বিতর্ক। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ সংস্থার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক পরিচালনা একটি নতুন বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। প্রস্তাবিত এই সংস্থার মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কুশনার পরিবারের সমর্থিত বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের কথাও সামনে এসেছে। ঘোষণার পরই ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা তীব্র আপত্তি জানিয়ে এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে।
ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কোম্পানিটি বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্সিং এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফিফার দাবি, এর ফলে ফুটবল থেকে আয় বহুগুণ বাড়বে এবং সেই অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
ফিফা জানিয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ফুটবলের আর্থিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা। ইনফান্তিনোর মতে, বিশ্ব ফুটবলের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও দক্ষভাবে কাজে লাগানোর জন্য একটি আধুনিক কর্পোরেট কাঠামো প্রয়োজন। তিনি দাবি করেছেন, এতে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলিও বেশি আর্থিক সুবিধা পাবে।
তবে ইউরোপীয় ফুটবল মহল এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। উয়েফা অভিযোগ করেছে, ফিফা কার্যত বিশ্ব ফুটবলের আত্মাকে বিক্রি করতে চাইছে। তাদের মতে, বিশ্বকাপ কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগের বিষয়। শুধুমাত্র মুনাফার লক্ষ্যে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে এর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হলে ফুটবলের মৌলিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উয়েফার আশঙ্কা, নতুন সংস্থার প্রধান লক্ষ্য হবে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিশ্চিত করা। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার, টিকিটের মূল্য, স্পনসরশিপ এবং প্রতিযোগিতার কাঠামো সবই বাণিজ্যিক স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। এতে ফুটবলপ্রেমীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ যদি ধীরে ধীরে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার, খেলোয়াড়দের উপর চাপ এবং প্রতিযোগিতার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে ক্লাব ফুটবলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কুশনার পরিবারের নাম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীদের এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রাজনৈতিক বিতর্কও উসকে দিয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, বিশ্ব ফুটবলের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কতটা গ্রহণযোগ্য।
ফিফা অবশ্য এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছে। সংস্থার দাবি, এখনও চূড়ান্ত কোনও চুক্তি হয়নি এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ফিফা আশ্বাস দিয়েছে যে প্রতিযোগিতার ক্রীড়াগত দিক, নিয়মকানুন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে। নতুন সংস্থা শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তবু বিরোধীরা মনে করছে, বাণিজ্যিক স্বার্থ একবার বড় হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত তা ক্রীড়া নীতিকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতা থেকে বিপুল আয় হওয়ায় ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একদিকে আয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফলে ফিফার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন শুধু আর্থিক উদ্যোগ নয়, বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আগামী মাসগুলিতে ফিফা, উয়েফা, ক্লাব সংগঠন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা কোন দিকে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্ব ফুটবলের এই নতুন অধ্যায়ের ভবিষ্যৎ।