(এই ’ । লেখাটি দুটি কিস্তিতে প্রকাশিত হবে
আজ প্রথম কিস্তি)
হাইলাইটস
বিদ্রোহী তৃণমূলের একাংশ এখন দাবি করছে, সমস্যার মূল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন ।
এই ন তুন তত্ত্ব অনুযায়ী দলের সব সাফল্যের কৃতিত্ব মমতার, আর স ব ব্যর্থতার দায় অভিষেকের।
গত এক দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা কিন্তু এই সরল । বিভাজনকে সমর্থন করে না
‘ মমতা ভালো, অভিষেক ’ খারাপ তত্ত্বটি আসলে রাজনৈতিক আত্মরক্ষার একটি সুবিধাজনক উপায়।
ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে গেলে একটি সমস্যা — থাকে পুরনো ইতিহাস মাঝেমধ্যে আপত্তি । জানায়
এক ন তুন উপকথার জন্ম
রাজনীতির ই তিহাসে উপকথার কোনও অভাব নেই। কখনও বলা হয় রাজা মহৎ, কিন্তু তাঁকে ঘিরে । থাকা মন্ত্রীরাই সর্বনাশের কারণ কখনও বলা হয় সর কার ভালো, কিন্তু কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা । সব নষ্ট করে দিয়েছে আবার কখনও শোনা যায়, নেতা সৎ এবং দূরদর্শী, কিন্তু তাঁকে ভুল । তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে এই ধরনের গল্পের — মূল উদ্দেশ্য একটাই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিকে দায়মুক্ত রাখা এবং সমস্ত ব্যর্থতার দায় অন্য । কারও কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই পুরনো গল্পেরই একটি নতুন সংস্করণ দ্রুত
জনপ্রিয় । হয়ে উঠছে বিদ্রোহী তৃণমূলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এখন একটি বিশেষ তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও স মস্যার কারণ নন; সমস্যার উৎস হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা । রাজনৈতিক বলয় দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, জনপ্রিয়তার ক্ষয়, কর্মীদের অসন্তোষ, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ,সবকিছুর নেপথ্যে নাকি । একজন ব্যক্তি
এই তত্ত্বের সৌন্দর্যহল, এটি অ । ত্যন্ত সরল জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একটি মাত্র চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ । করে দেওয়া যায় ফলে দল সম্পর্কে হতাশ কর্মীরাও স্বস্তি পান, কারণ তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে । দায়ী করতে হয় না আবার বিদ্রোহী নেতারাও নিজেদের অতীতকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে বাধ্য হন
না। সমস্যাটা তখন আর গোটা ব্যবস্থার নয়; সমস্যাটা । একজন মানুষের
অভিষেক কি গতকাল রাজনীতিতে এসেছেন?
এই ন তুন তত্ত্বের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি হল তার স্মৃতিশক্তি। শুনলে মনে হয় অভিষেক
বন্দ্যোপাধ্যায় যেন হঠাৎ কোনও একদিন আকাশ থেকে নেমে এসে তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় শক্তিকেন্দ্র । হয়ে উঠেছেন যেন গত কয়েক মাস আগে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন এবং তার । পর থেকেই সমস্ত বিপর্যয় শুরু হয়েছে
বাস্তবতা । সম্পূর্ণভিন্ন গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের অন্যতম । গুরুত্বপূর্ণমুখ সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নির্বাচনী কৌশল, জেলা নেতৃত্বের বিন্যাস, নতুন প্রজন্মের — নেতাদের উত্থান প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর । ভূমিকা ছিল প্রকাশ্য এবং সুপরিচিত তিনি
কোনও । গোপন শক্তিকেন্দ্র ছিলেন না বরং তাঁকে সামনে এনে, তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং তাঁর চারপাশে একটি নতুন ক্ষমতার বলয় গ । ড়ে তুলেই দল এগিয়েছে
এখানেই । প্রশ্ন উঠতে শুরু করে যদি আজ বলা হয় যে সেই বলয়ই সমস্ত সমস্যার মূল, তাহলে সেই বলয়কে তৈরি করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলিও আলোচনার । মধ্যে আসবে কারণ কোনও রাজনৈতিক । কাঠামো নিজে নিজে তৈরি হয় না তাকে তৈরি করা হয়, তাকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং । তাকে টিকিয়ে রাখা হয়
সাফল্য মমতার, ব্যর্থতা অভিষেকের
এই ন । তুন তত্ত্বের যুক্তিবিদ্যা সত্যিই অভিনব এর মূল । সূত্রটি খুব সহজ তৃণমূল কোনও নির্বাচন জিতলে তার কৃতিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা। কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি জনপ্রিয়
হলে । সেটি তাঁর দূরদৃষ্টি কোনও নেতা জনসমর্থন পেলে । সেটি তাঁর নেতৃত্বের সাফল্য কিন্তু একই সময়ে যদি কোনও সিদ্ধান্ত ব্যর্থহয়, যদি কোনও সাংগঠনিক সমস্যা দেখা দেয়, যদি কোনও নেতা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন অথবা দলের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে, তাহলে তার দায় চলে যায় অভিষেক । বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ অ । ত্যন্ত সহজ হয়ে যায় সাফল্যের স ব আলো একটি দিকে যাবে, ব্যর্থতার সব । অন্ধকার আরেক দিকে ফলে নেতৃত্বের কোনও স মালোচনা না করেও দলের বর্তমান সংকট । নিয়ে আলোচনা করা যায় কিন্তু বাস্তব রাজনীতি । এতটা সরল নয় কোনও বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনের সাফল্য এবং ব্যর্থতা উভয়ই সাধারণত বহু মানুষের সিদ্ধান্ত, বহু স্ত রের
ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল।
দিদি কি কিছুই জানতেন না?
“ মমতা ভালো, অভিষেক ” খারাপ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় । ভিত্তি হল একটি অদ্ভুত অনুমান সেই অনুমান অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দলের ভেতরে কী ঘটছে সে সম্পর্কেপুরোপুরি অবগত ছিলেন । না কারা গুরুত্বপূর্ণপদ পাচ্ছেন, কোন জেলায় কার প্রভাব বাড়ছে, কার হাতে সাংগঠনিক দায়িত্ব যাচ্ছে, কোন রাজনৈতিক কৌশল নেওয়া হচ্ছে,এসব । কিছুই নাকি তাঁর অজানা ছিল
এই ধারণাটি মেনে নিতে গেলে মমতা
বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কেসম্পূর্ণ ভিন্ন এ । কটি ছবি আঁকতে হয় কারণ তাঁর সমর্থকেরা বরাবর তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি দলের ক্ষুদ্রতম বিষয়
সম্পর্কেও স । চেতন যিনি প্রশাসনের সূক্ষ্মতম বিষয় পর্যন্ত নজ । রে রাখেন যিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে । অসাধারণভাবে অবহিত
তাহলে একইসঙ্গে কীভাবে বলা যায় যে তিনি সব জানতেন, আবার কিছুই জানতেন না? তিনি সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন, আবার দলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিকেন্দ্র সম্পর্কেঅজ্ঞ ছিলেন? এই দুই দাবিকে । একসঙ্গে সত্য বলে মেনে নেওয়া কঠিন
রাজনৈতিক ধোপার ঘাট
আসলে পুরো বিষয়টি অনেকটা রাজনৈতিক ধোপার । ঘাটের মতো দীর্ঘদিন একটি ব্যবস্থার অংশ হয়ে থাকার পর এখন অনেকেই নিজেদের অতীতকে ধুয়ে–মুছে । পরিষ্কার করতে চাইছেন তাঁরা এমন একটি ব্যাখ্যা খুঁজছেন, যাতে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও রক্ষা করা যায়
এবং বর্তমান অসন্তোষ থেকেও দূরত্ব বজায় রাখা যায়।
কিন্তু ই । তিহাসের একটি সমস্যা আছে তাকে ধোয়া যায় । না যাঁরা একসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানকে সমর্থন করেছেন, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, তাঁর স ভায় মঞ্চ ভাগ করেছেন এ বং তাঁর নেতৃত্বকে ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন, তাঁদের পক্ষে আজ সম্পূর্ণ উল্টো । গল্প বলা সহজ নয় কারণ রাজনীতির স্মৃতি । আগের মতো ক্ষণস্থায়ী নেই পুরনো বক্তৃতা, পুরনো ভিডিও, পুরনো সংবাদপ্রতিবেদন এবং পুরনো অবস্থান সবই কোথাও না কোথাও রয়ে যায়।
ফলে ইতিহাসকে নতুন করে লেখার চেষ্টা যত বাড়ে, ততই । পুরনো ইতিহাস মাথা তুলে দাঁড়ায়
কেন এই তত্ত্ব এত জনপ্রিয় হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাজনীতির চেয়ে মনস্তত্ত্বের । দিকে তাকাতে হয় কারণ এই তত্ত্ব শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রক্ষা করে না, এটি বহু বিদ্রোহী । নেতাকেও রক্ষা করে যদি বলা যায় যে সমস্যাটা গোটা নেতৃত্বের নয়, কেবল একজন ব্যক্তির, তাহলে অতীতের সঙ্গে সম্পর্কপুরোপুরি ছিন্ন । করতে হয় না ভবিষ্যতের জন্যও দরজা খোলা । থাকে প্রয়োজন হলে আবার ফিরে যাওয়ার পথও অ । ক্ষত থাকে
সেই “ কারণেই মমতা ভালো, অভিষেক ” খারাপ তত্ত্বটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক । আত্মরক্ষার কৌশল এটি বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নয়; বরং এমন একটি ব্যাখ্যা, যা অনেকের জ । ন্য সুবিধাজনক
আর সুবিধাজনক ব্যাখ্যা এবং সত্য ব্যাখ্যা সবসময় এ । ক জিনিস নয় অনেক সময় তাদের মধ্যে । দূরত্বই সবচেয়ে বেশি (বাকিটা আগামীকাল)