হাইলাইটস
- তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট শুধু সাংগঠনিক নয়, নেতৃত্বের সংকটও।
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
- কিন্তু দলের একাংশের অভিযোগ, এই উত্তরাধিকার প্রকল্পই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
- অভিষেকের পক্ষে এখনও কিছু শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে—তরুণ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও প্রচারক্ষমতা।
- তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে কেন্দ্র করেই দলের বড় অংশের আপত্তি তৈরি হওয়ায় মমতার ঘুরে দাঁড়ানোর পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন কোনও দলের সামনে মূল প্রশ্নটি আর নীতি, কর্মসূচি বা আদর্শের থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় নেতৃত্বের। কে দলকে টেনে তুলতে পারবেন? কে ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে কর্মীদের আবার একত্র করতে পারবেন? পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও নিঃসন্দেহে দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সংগ্রামের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে দলের অন্য কারও তুলনা চলে না। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হল, একজন নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব সময় দলের সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। বিশেষ করে যখন দলের ভিতরে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আবার রাজনৈতিক পুনরুত্থান ঘটাতে পারবেন?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ নয়, কয়েকটি কঠিন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।
প্রথম বাস্তবতা হল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আজ তৃণমূলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দ্বিতীয় ব্যক্তি। গত এক দশকে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর প্রায় প্রতিটি স্তরে তাঁর প্রভাব বেড়েছে। যুব তৃণমূল থেকে শুরু করে সাংসদ নির্বাচন, জেলা পর্যায়ের নেতৃত্ব, প্রচারকৌশল, ডিজিটাল প্রচার—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছাপ স্পষ্ট।
অর্থাৎ তিনি কোনও আকস্মিক নেতা নন। দীর্ঘ পরিকল্পনার মাধ্যমে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় বাস্তবতা সামনে আসে।
তাঁর উত্থান যত দ্রুত হয়েছে, তত দ্রুতই দলের ভিতরে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষও জমেছে।
তৃণমূলের বহু প্রবীণ নেতা বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে দল ক্রমশ একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত কয়েকজনের হাতে চলে গেছে। জেলা নেতৃত্বের স্বাধীনতা কমেছে। পুরনো নেতাদের গুরুত্ব কমেছে।
এই অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হল ধারণা বা perception। দলের বড় অংশ যদি মনে করে তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তাহলে সেই ধারণাই রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।
বর্তমান সংকটের সময় যে সংখ্যক নেতা, বিধায়ক বা সাংসদ প্রকাশ্যে বা নীরবে দূরত্ব তৈরি করেছেন, তা দেখেই বোঝা যায় সমস্যাটি কেবল বিরোধীদের প্রচার নয়।
তৃতীয় বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তির উৎস ছিল তাঁর “অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট” ভাবমূর্তি। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের নেত্রী, যিনি প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হল তিনি ক্ষমতার উত্তরাধিকারী। তাঁর নেতৃত্বকে অনেকেই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত নয়, বরং পারিবারিক উত্তরাধিকারের ফল বলে মনে করেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোনও দল যখন সংকটে পড়ে, তখন এই প্রশ্নগুলি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
চতুর্থ বাস্তবতা হল, অভিষেকের কিছু শক্তিশালী ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
তাঁর বয়স কম। তিনি প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রচারকৌশল সম্পর্কে সচেতন। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তরুণ কর্মীদের একাংশ এখনও তাঁকে ভবিষ্যতের মুখ বলে মনে করে।
তৃণমূলে এমন আর কোনও নেতা নেই যিনি একই সঙ্গে জাতীয় পরিচিতি, সাংসদ হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে ধারণ করেন।
অর্থাৎ তাঁকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোনও নেতার শক্তি তখনই কার্যকর হয় যখন তিনি দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করতে পারেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল তিনি ঐক্যের প্রতীক, না বিভাজনের?
যদি দলের অসন্তুষ্ট অংশের একটি বড় অংশ মনে করে যে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অভিষেকের নেতৃত্বে নিরাপদ নয়, তাহলে শুধুমাত্র সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে কোনও দল উত্তরাধিকার নির্ভর নেতৃত্বের কারণে দুর্বল হয়েছে। আবার এমন উদাহরণও আছে যেখানে দ্বিতীয় প্রজন্ম সফলভাবে দলকে নতুন রূপ দিয়েছে।
পার্থক্যটা এক জায়গায়।
সফল উত্তরাধিকারীরা সাধারণত নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন দলের ভিতরে। কেবল পারিবারিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করেন না।
আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেটাই। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি নন, তিনি নিজেও একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে প্রশ্ন আরও কঠিন। তিনি কি দলের পুনর্গঠনের স্বার্থে নেতৃত্বের কাঠামো আরও বিস্তৃত করবেন? তিনি কি প্রবীণ ও অসন্তুষ্ট নেতাদের জন্য নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করবেন? নাকি আগের পথেই এগোবেন?
যদি তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন, তাহলে ঝুঁকি থাকবে যে দলের বর্তমান সংকট আরও গভীর হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক দল শেষ পর্যন্ত কোনও পরিবারের সম্পত্তি নয়। তা একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। সেখানে বিভিন্ন স্বার্থ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মতামতকে জায়গা দিতে হয়।
সুতরাং প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত উত্তর হল—হ্যাঁ, অভিষেককে সামনে রেখেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘুরে দাঁড়ানো তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। কিন্তু তার জন্য অভিষেককে দলের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মমতাকে প্রমাণ করতে হবে যে তৃণমূল এখনও একটি বহুমতের রাজনৈতিক সংগঠন।
যদি সেই পরিবর্তন না আসে, তাহলে অভিষেক রথের সারথি হলেও রথের চাকা কাদায় আটকে থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে। আর তখন সমস্যাটা সারথির দক্ষতার নয়, রথের ভিতরের কাঠামোর হয়ে দাঁড়াবে।