মে ২০২৬-এর শুরুতে ভারতীয় শেয়ারবাজারে ছিল আশাবাদের আবহ। এপ্রিল মাসে বাজারের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের পর অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেছিলেন, সেই ঊর্ধ্বগতি আরও কিছুদিন চলবে। দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীল বৃদ্ধি, নিয়মিত এসআইপি (SIP) বিনিয়োগের প্রবাহ এবং কর্পোরেট মুনাফার ইতিবাচক প্রত্যাশা বাজারকে ভরসা জোগাচ্ছিল।
অনেকেই তখন ওয়াল স্ট্রিটের পুরনো প্রবাদ—“Sell in May and go away” (মে মাসে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে দূরে থাকো)—কে অচল বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির গল্প এবং দেশীয় বিনিয়োগের শক্তিশালী ভিত্তি বাজারকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অন্য কথা বলল।
হাইলাইটস
মে মাসে সেনসেক্স ২.৮ শতাংশ এবং নিফটি ১.৯ শতাংশ কমেছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।
বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII) মে মাসে প্রায় ৫৫,৯৬৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন।
ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য নেমে রেকর্ড ৯৬.৯৬-এ পৌঁছেছে।
মার্কিন ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন এক বছরে সর্বোচ্চ ৪.৬ শতাংশে উঠেছে।
তবুও দীর্ঘমেয়াদে ভারতের শেয়ারবাজার নিয়ে আশাবাদী মর্গ্যান স্ট্যানলি।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুনে সেনসেক্স ৮৯,০০০-এ পৌঁছাতে পারে।
তেল, যুদ্ধ ও বিদেশি বিক্রির চাপে বাজার
মে মাস জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত বাজারকে অস্থির করে তোলে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেশিরভাগ সময়ই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।
এর ফলে তিনটি বড় উদ্বেগ সামনে আসে—
প্রথমত, ভারতের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।
তৃতীয়ত, চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit) বাড়ার সম্ভাবনা।
এদিকে কেন্দ্র সরকারও পরপর খুচরো জ্বালানির দাম বাড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষের খরচ করার ক্ষমতা এবং সংস্থাগুলির লাভের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়।
ফাইয়ার্স-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তেজস খোদায়ের কথায়,
“তেলের দাম বৃদ্ধিই পুরো মাসজুড়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে রেখেছিল। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে টাকার উপর।”
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড়সড় বিক্রি
মে মাসে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে প্রায় ৫৫,৯৬৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন।
এর প্রধান কারণ ছিল মার্কিন সরকারি বন্ডের ফলন বৃদ্ধি। যখন মার্কিন বন্ডে বেশি সুদ পাওয়া যায়, তখন বিশ্বজুড়ে অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে টাকা সরিয়ে নিরাপদ মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগ করতে পছন্দ করেন।
ফলে ভারতের বাজার থেকে অর্থ বেরিয়ে যেতে শুরু করে।
একই সঙ্গে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য রেকর্ড সর্বনিম্ন ৯৬.৯৬-এ নেমে আসে, যা বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
কর্পোরেট ফলাফল হতাশ না করলেও উচ্ছ্বাসও জাগাতে পারেনি
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রৈমাসিকের (Q4FY26) ফলাফল মোটামুটি প্রত্যাশামাফিক হয়েছে।
তবে বাজারকে নতুন করে চাঙ্গা করার মতো কোনও বড় ইতিবাচক চমক দেখা যায়নি।
রেলিগেয়ার ব্রোকিং-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান অজিত মিশ্র বলেন,
“মাসের শুরুতে বাজারে আশাবাদ ছিল। কিন্তু দ্রুতই আন্তর্জাতিক ঝুঁকিগুলি সামনে চলে আসে। তেলের দাম, বন্ডের ফলন এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ফলে বিভিন্ন খাতে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।”
এবার বাজার কোন দিকে যাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে কয়েকটি বিষয় বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে—
অপরিশোধিত তেলের দাম
ডলারের তুলনায় টাকার অবস্থান
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের জুন মাসের নীতিগত ঘোষণা
বর্ষার অগ্রগতি
গ্রামীণ চাহিদার পরিস্থিতি
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব
স্যামকো সিকিউরিটিজ-এর গবেষণা প্রধান অপূর্ব শেঠ মনে করেন,
“জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, সেটাই আগামী দিনে বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হতে পারে।”
তাঁর মতে, এই সমস্ত কারণ মিলিয়ে আপাতত শেয়ারবাজারের উপর চাপ বজায় থাকবে।
বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের সামগ্রিক গতিবিধির চেয়ে ভালো সংস্থা বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অজিত মিশ্রের মতে,
“যেসব সংস্থার আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা স্পষ্ট, ঋণের বোঝা কম এবং নিয়মিত নগদ প্রবাহ রয়েছে, সেগুলির উপর নজর দেওয়া উচিত।”
অর্থাৎ সূচকের ওঠানামার চেয়ে কোম্পানি নির্বাচন এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দীর্ঘমেয়াদে ভারতের উপর বড় বাজি মর্গ্যান স্ট্যানলির
স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি থাকলেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক মর্গ্যান স্ট্যানলি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী।
তাদের মতে, ভারতীয় শেয়ারবাজারের গত ১২ মাসের আপেক্ষিক পারফরম্যান্স ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল পর্যায়ে রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অবস্থানও বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
কিন্তু এটাই ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করছে।
মর্গ্যান স্ট্যানলির মতে—
“তেলজনিত মূল্যস্ফীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত কিছু ঝুঁকি বাদ দিলে, বহুমেরু বিশ্বের অন্যতম বড় লাভবান দেশ হতে পারে ভারত।”
সংস্থাটির ধারণা, আগামী দশকে ভারতের অর্থনীতিতে উৎপাদন শিল্পের (Manufacturing) অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এআই ও ডেটা সেন্টারের যুগে ভারতের সুযোগ
মর্গ্যান স্ট্যানলি আরও বলছে, ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম।
এর ফলে—
ডেটা সেন্টার শিল্পে বড় উত্থান আসতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির প্রসার দ্রুত হবে।
শ্রম উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ভারতের উৎপাদনশীলতার বর্তমান স্তর তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, এআই-নির্ভর উন্নতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে ভারত থাকতে পারে বলে তাদের মত।
২০২৭ সালে সেনসেক্স ৮৯,০০০?
মর্গ্যান স্ট্যানলির মূল পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে সেনসেক্স ৮৯,০০০ পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে।
তারা বিশেষভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে—
আর্থিক পরিষেবা খাত
ভোক্তা ব্যয়-নির্ভর খাত
শিল্প ও পরিকাঠামো খাত
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম পছন্দ করছে—
জ্বালানি খাত
ধাতু ও কাঁচামাল খাত
বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি খাত
স্বাস্থ্য পরিষেবা খাত
উপসংহার
মে ২০২৬ ভারতীয় শেয়ারবাজারের জন্য ছিল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মাস। যুদ্ধ, তেলের দাম, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং টাকার দুর্বলতা বাজারকে নিচের দিকে টেনেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনীতি, উৎপাদন শিল্পের বিস্তার, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনও অক্ষুণ্ণ।
তাই আপাতত বাজারে সতর্কতা থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের গল্প এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং অনেকের মতে, আসল গল্পটি হয়তো এখনই শুরু হচ্ছে।