কাটমানি ফেরতের মরসুম: বাংলার রাজনীতিতে ‘পোস্ট-পাওয়ার সেটেলমেন্ট’

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ভোটে পরাজয়ের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সাধারণত দুটি কাজ থাকে।
- দ্বিতীয়ত, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করা।
- কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার নাকি এক অভিনব তৃতীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ভোটে পরাজয়ের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সাধারণত দুটি কাজ থাকে। প্রথমত, পরাজয়ের কারণ খোঁজা। দ্বিতীয়ত, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার নাকি এক অভিনব তৃতীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শোনা যাচ্ছে, বহু প্রাক্তন তৃণমূল নেতা ও স্থানীয় ক্ষমতাবানদের এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়ে উঠেছে পুরনো হিসাব মেটানো। যে দল একসময় জনসংযোগ, উন্নয়ন এবং সংগঠন বিস্তারের কথা বলত, তাদের অনেক নেতার কাছে এখন জনসংযোগের নতুন অর্থ দাঁড়িয়েছে পাওনাদারদের ফোন ধরা এবং ক্ষুব্ধ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
রাজনীতির ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। একসময় যাঁদের বাড়ির সামনে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, যাঁদের একবার দেখা পাওয়া মানেই ছিল প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনা, আজ তাঁদের অনেকের অবস্থাই উল্টে গিয়েছে। এখন নাকি বহু জায়গায় সেই সাধারণ মানুষই দরজায় কড়া নাড়ছেন। তবে আর কোনও সুপারিশের আবেদন নিয়ে নয়। তাঁরা এসেছেন হিসাব চাইতে। তাঁদের বক্তব্য সরল—যে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেই কাজ হয়নি; কাজেই টাকা ফেরত চাই।
বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধীরা অভিযোগ করে এসেছে যে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, স্থানীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, নির্মাণকাজ, চাকরির সুপারিশ, ক্লাব অনুদান কিংবা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে ঘিরে এক ধরনের অঘোষিত আর্থিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। সেই অভিযোগকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করেছে। যাঁরা একসময় অভিযোগ করতে ভয় পেতেন, তাঁরা এখন মুখ খুলছেন। যাঁরা আগে চুপ করে থাকতেন, তাঁরা এখন পুরনো ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এবং যাঁরা আগে নিজেদের অসহায় ভাবতেন, তাঁরা এখন নিজেদের পাওনা দাবি করার অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন।
এই পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল ভয় নামক রাজনৈতিক সম্পদের দ্রুত অবমূল্যায়ন। ক্ষমতা থাকলে অনেক কিছুই চাপা পড়ে থাকে। অভিযোগ থাকে, কিন্তু উচ্চারিত হয় না। ক্ষোভ থাকে, কিন্তু প্রকাশ পায় না। কারণ অভিযোগকারীরা জানেন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য দিতে হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই সমীকরণ বদলে যায়। যে মানুষ গতকাল পর্যন্ত ভয়ে চুপ ছিলেন, তিনিই আজ প্রশ্ন করতে শুরু করেন। যে নেতা গতকাল পর্যন্ত জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ছিলেন, তিনিই আজ ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হন।
ফলে রাজ্যের নানা জায়গায় এখন অদ্ভুত সব দৃশ্যের কথা শোনা যাচ্ছে। বহু প্রাক্তন নেতা বা জনপ্রতিনিধি নাকি এমন আচরণ করছেন যেন গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্কই ছিল না। কেউ বলছেন, তিনি কিছুই জানতেন না। কেউ বলছেন, সব কাজ কর্মীরাই করত। কেউ দাবি করছেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্যেরা টাকা তুলেছে। আবার কেউ এমনভাবে নির্দোষ সাজার চেষ্টা করছেন যে তাঁদের বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, গোটা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তাঁরাই।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় নির্মম হয়। মানুষের স্মৃতি নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ধারণা সাধারণত খুব উচ্চমানের নয়। তাঁরা প্রায়ই ধরে নেন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব অভিযোগ মুছে যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক কিছু ভুলে গেলেও নিজের আর্থিক ক্ষতির কথা খুব কমই ভুলে। কোনও পরিবার যদি বাড়ি তৈরির অনুমতির জন্য টাকা দিয়ে থাকে, কোনও যুবক যদি চাকরির আশায় কারও হাতে অর্থ তুলে দিয়ে থাকে, অথবা কোনও ব্যবসায়ী যদি কোনও প্রশাসনিক সুবিধার আশায় অর্থ ব্যয় করে থাকেন, তাহলে সেই স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ারই কথা। ফলে আজ যখন রাজনৈতিক সুরক্ষা বলয় দুর্বল হয়েছে, তখন বহু মানুষ সেই পুরনো হিসাব সামনে আনছেন।
অনেক ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে, পুরনো মোবাইল মেসেজ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, অডিও রেকর্ডিং কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়ে মানুষ হাজির হচ্ছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিতর্ক ধীরে ধীরে হিসাববিজ্ঞানের রূপ নিচ্ছে। আগে যেখানে রাজনৈতিক সভা হত, সেখানে এখন নাকি চলছে অডিটের পরিবেশ। আগে যেখানে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হত, সেখানে এখন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে—প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নেওয়া অর্থের কী হল।
এই পরিস্থিতি শুধু কোনও একটি দলের জন্য অস্বস্তিকর নয়; এটি গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। ক্ষমতার সঙ্গে অনেকেই এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে তাঁরা মনে করেন রাজনৈতিক প্রভাব চিরস্থায়ী। প্রশাসন, সংগঠন, প্রচারযন্ত্র এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে তাঁরা নিজেদের স্থায়ী সম্পত্তি বলে ধরে নিতে শুরু করেন। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং নিষ্ঠুরতা—দুইই এখানেই যে ভোটার শেষ পর্যন্ত নিজের রায় নিজেই দেন। সেই রায়ে কখনও জনপ্রিয় নেতা পরাজিত হন, কখনও দুর্ভেদ্য সংগঠন ভেঙে পড়ে, কখনও অজেয় বলে পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামো মুহূর্তে নড়বড়ে হয়ে যায়।
বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি সেই সত্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা ভেবেছিলেন সংগঠনই তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি, তাঁরা এখন উপলব্ধি করছেন যে সংগঠনেরও ভিত্তি থাকে। সেই ভিত্তির নাম জনসমর্থন। জনসমর্থন যখন ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভবনও ভিত হারাতে থাকে। আর ভিত দুর্বল হয়ে গেলে অতীতের সব চাপা ক্ষোভ একে একে উপরে উঠে আসে।
এই কারণেই কথিত কাটমানি ফেরতের ঘটনাগুলি নিছক আর্থিক লেনদেনের প্রশ্ন নয়। এগুলি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বেরও প্রতিফলন। এগুলি দেখাচ্ছে যে মানুষ কেবল ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করে না; প্রয়োজন হলে তারা অতীতের হিসাবও খুলে বসে। তারা জানতে চায় কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কে কী করেছে, এবং কে কী নিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর সবসময় রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া যায় না।
রাজনীতিতে প্রায়ই ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’-এর কথা বলা হয়। অর্থাৎ বিনিয়োগের বিনিময়ে কী লাভ হল। কিন্তু বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিধানে যেন নতুন একটি ধারণা যুক্ত হয়েছে—‘রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট’। অর্থাৎ, লাভ না হলে অন্তত মূলধনটা ফেরত চাই। বিষয়টি ব্যঙ্গাত্মক শোনালেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক বার্তা। ভোটার হয়তো সবসময় উচ্চকণ্ঠ নন, কিন্তু তিনি হিসাব রাখতে জানেন। এবং যখন তিনি সেই হিসাব মেলাতে বসেন, তখন বহু বছরের রাজনৈতিক সমীকরণও মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।
আজ রাজ্যের বহু প্রাক্তন ক্ষমতাধর নেতার সামনে তাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি কোনও সাংবাদিক, কোনও তদন্তকারী সংস্থা বা কোনও বিরোধী নেতা করছেন না। প্রশ্নটি করছেন সেই সাধারণ মানুষ, যাঁদের সমর্থনের উপর দাঁড়িয়েই একদিন তাঁদের রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল। প্রশ্নটি খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত অস্বস্তিকর—“কাজটা তো হল না, এবার টাকাটা কবে ফেরত পাব?”
সম্ভবত বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই একটিমাত্র প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে বহু প্রাক্তন ক্ষমতাবান মানুষের মনে। কারণ ভোটের ফলাফল পাল্টানো যায় না, কিন্তু তার পরে শুরু হওয়া হিসাবনিকাশ অনেক সময় আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



