Home খবর ট্রাম্পের ‘বিগ অ্যাটাক’ হুঁশিয়ারি, যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য

ট্রাম্পের ‘বিগ অ্যাটাক’ হুঁশিয়ারি, যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
46 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ইরানের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প।
  • হুথিদের হামলার পর ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াল ব্রেন্ট তেলের দাম।
  • হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব—দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথই এখন সংঘাতের ঝুঁকিতে।
  • জাতিসংঘের সতর্কবার্তা, মধ্যপ্রাচ্য ‘অকল্পনীয় বিপর্যয়ের’ কিনারায়।
  • সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘাত নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই হুঁশিয়ারির মধ্যেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য, আর তার ধাক্কা পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘বিশাল’ একটি হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন—যা এর আগে হওয়া হামলাগুলির থেকেও বড় হতে পারে। তাঁর কথায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন তিনি এবং যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, প্রয়োজনে ইজরায়েল মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এই অভিযানে যোগ দিতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইজরায়েলের সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

এই হুঁশিয়ারির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট খুলেছে সমুদ্রপথে।

ফের ১০০ ডলারের ওপরে তেলের দাম

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানকে ঘিরে সংঘাত আরও বাড়লে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আগে থেকেই তীব্র ছিল। এবার লোহিত সাগর ও বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতেও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি ট্যাঙ্কারে হামলা, নতুন বিপদ

ট্রাম্পের মন্তব্যের আগে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুথিরা। হুথিদের সংবাদমাধ্যম সাবার দাবি, ‘এনসেলিয়া’ ও ‘লায়লা’ নামে দুটি জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে লক্ষ্য করা হয়। হামলার পর দুটি জাহাজেই আগুন ধরে যায়। তবে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

সৌদি-সংযুক্ত জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণার পর এটিই হুথিদের প্রথম বড় সামুদ্রিক হামলা বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হুথিরা ফের একই ধরনের হামলা চালালে তার দায় সরাসরি ইরানের ওপর চাপানো হবে। তাঁর দাবি, হুথিরা ইরানের ‘প্রক্সি’ এবং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য তেহরানকেও বড় সামরিক মূল্য দিতে হবে।

‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ মধ্যপ্রাচ্য?

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নিরাপত্তা পরিষদে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ‘অকল্পনীয় বিপর্যয়ের’ কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

একটি সংকট থেকে আরেকটি সংকটের জন্ম হচ্ছে, এক উত্তেজনা থেকে আরেক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে—এই পরিস্থিতি গোটা অঞ্চলকে একটি বিস্তৃত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

সম্ভাব্য বড় সংঘাতের আশঙ্কায় পশ্চিমা দেশগুলিও সতর্ক হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ইরান থেকে সাময়িকভাবে কূটনৈতিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মানি লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকা দুটি নৌজাহাজ প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছে।

সৌদির পরমাণু কর্মসূচিতে ট্রাম্পের নতুন শর্ত

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরবের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন শর্তের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে পরমাণু শক্তি কর্মসূচিতে সাহায্য করতে পারে, তবে তার আগে রিয়াদকে ইজরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।

তবে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্ন নেই।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার অভিযোগ

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে চারটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, গত ১৩ জুলাই তেহরান থেকে ইয়েমেনে একটি বিমানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছিল। ওই চালানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সামরিক উপকরণ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

একই সময়ে ইরান হুথিদের বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে ইরান বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব-আল-মান্দেব?

বাব-আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করে।

এই রুট দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে তেলের বাজারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলও বড় ধাক্কা খেতে পারে।

সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে দেশটি সম্প্রতি ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহনের ওপর বেশি নির্ভর করছিল। কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর সেই বিকল্প রুটও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ একইসঙ্গে বিপদের মুখে পড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে ‘ডাবল হ্যামার’ বা দ্বিগুণ আঘাতের সঙ্গে তুলনা করছেন।

‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নিয়ে বাড়ছে হুমকি

ইরানের গোপন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নিয়েও সাম্প্রতিক দিনগুলিতে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।

ইজরায়েলের দাবি, পাহাড়ের গভীরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, প্রয়োজনে ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাতেও মার্কিন হামলা হতে পারে।

উত্তেজনার ফাঁদে ট্রাম্প?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এক ধরনের ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। একদিকে ইরান ও তার মিত্রদের হামলা, অন্যদিকে তার জবাবে আরও কঠোর মার্কিন সামরিক হুমকি—এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে ক্রমশ আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।

এরই মধ্যে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান থেকে ছোড়া কোনও ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজকে লক্ষ্য করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ইরানকে বড় মূল্য দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, তেহরানকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি বুঝতে হবে।

বাড়ছে ট্রাম্পের ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু আন্তর্জাতিক সংকট নয়, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও বড় চাপ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও যুক্তরাষ্ট্রে সর্বসম্মত সমর্থন পাচ্ছে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের একটি অনুকূল সমাধান খুঁজে বের করার চাপও তাই বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক না হলেও, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরে ইরান নীতি নিয়ে বাড়তে থাকা মতভেদের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

যুদ্ধের দোরগোড়ায় মধ্যপ্রাচ্য

একদিকে হরমুজ প্রণালি, অন্যদিকে বাব-আল-মান্দেব—বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথই এখন সংঘাতের কেন্দ্রে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বৃহত্তম মার্কিন হামলার হুমকি, ইজরায়েলের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অস্থিরতা।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল সামরিক পদক্ষেপই আঞ্চলিক সংঘাতকে সর্বাত্মক যুদ্ধে পরিণত করতে পারে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে এর অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতেও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles