Home খবর নবান্নে ‘ফ্রেশার্স ডে’! পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভা কি প্রশাসনের ল্যাবরেটরি?

নবান্নে ‘ফ্রেশার্স ডে’! পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভা কি প্রশাসনের ল্যাবরেটরি?

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 5 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ নিলেন একসঙ্গে।
  • অধিকাংশেরই কোনও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই।
  • কর্পোরেশন, পুরসভা, পঞ্চায়েত— কোথাও দীর্ঘ প্রশাসনিক ট্র্যাক রেকর্ড নেই।
  • নবান্নে এখন আমলা বনাম নবীন মন্ত্রীদের এক অদ্ভুত রসায়নের পরীক্ষা শুরু।
  • সমর্থকদের দাবি: “পুরনো রোগের চিকিৎসায় নতুন ডাক্তার দরকার।”
  • সমালোচকদের কটাক্ষ: “এটা মন্ত্রিসভা নয়, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম।”

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেছে। কিন্তু লোকভবনের সাম্প্রতিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখে অনেক পুরনো আমলা নাকি নীরবে একে অপরকে জিজ্ঞেস করেছেন — “এবার আমরা কাকে ব্রিফ করব?” কারণ নতুন সরকারের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা যতটা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, ততটাই প্রশাসনিকভাবে অভিনব।

শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। পূর্ণমন্ত্রী, স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে এই বিশাল দল এখন পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক স্টিয়ারিং হাতে নিয়েছে। সমস্যা হল, গাড়িটা চালানোর অভিজ্ঞতা কারও খুব একটা নেই।

এক অর্থে পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি মন্ত্রিসভা তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আছে, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আছে, টেলিভিশনের ডিবেটে চিৎকার করার অভিজ্ঞতা আছে, ফেসবুক লাইভ করার অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু সচিবালয়ের ফাইল কীভাবে ঘোরে, অর্থদফতরের অনুমোদন কীভাবে আসে, টেন্ডার কেন আটকে যায়, বা কোনও প্রকল্পের ডিপিআর কী জিনিস সে বিষয়ে অনেকেরই বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায় শূন্য।

নবান্নের করিডরে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় বাক্য নাকি: “স্যার, এই নোটটা পড়ে সই করে দিন।” আর তার উত্তরে মন্ত্রীর প্রশ্ন: “নোট মানে? হোয়াটসঅ্যাপ নোট?”

রাজনৈতিকভাবে অবশ্য বিজেপির সামনে বিকল্পও খুব বেশি ছিল না। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে এমন কোনও বড় প্রশাসনিক ক্যাডার তৈরি হয়নি যারা মন্ত্রী হওয়ার আগেই সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তৃণমূলের মতো তাদের হাতে ছিল না একাধিক পুরসভা, উন্নয়ন পর্ষদ, মন্ত্রীত্ব বা দীর্ঘ সরকারি অভিজ্ঞতার পুল। ফলে দলকে ভরসা করতে হয়েছে প্রথম সারির রাজনৈতিক মুখ, আন্দোলনের কর্মী, সাংগঠনিক নেতা এবং নির্বাচনী যোদ্ধাদের উপর।

এই মন্ত্রিসভার তালিকা দেখলে একটা জিনিস স্পষ্ট হয় — এটি মূলত “রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মন্ত্রিসভা”, “প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মন্ত্রিসভা” নয়। উত্তরবঙ্গ আছে, জঙ্গলমহল আছে, কলকাতা আছে, সীমান্ত এলাকা আছে, দলিত প্রতিনিধি আছেন, আদিবাসী প্রতিনিধি আছেন, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বার্তাটা পরিষ্কার: “প্রথমে সবাইকে জায়গা দাও, পরে কাজ শেখা যাবে।”

এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের আমলাতন্ত্র এখন এক অদ্ভুত শক্তির অধিকারী হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্রশাসনের একটি অলিখিত নিয়ম আছে — মন্ত্রী যদি অত্যন্ত শক্তিশালী হন, আমলা সাবধানে চলেন। মন্ত্রী যদি অত্যন্ত অভিজ্ঞ হন, আমলা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন। আর মন্ত্রী যদি সম্পূর্ণ নতুন হন, তখন আমলাই হয়ে ওঠেন প্রকৃত জিপিএস।

নতুন মন্ত্রিসভার বহু সদস্য আগামী কয়েক মাসে বুঝতে পারবেন যে দফতরের গাড়ি, লালবাতি আর পিএসও পাওয়াটাই মন্ত্রীত্বের সবচেয়ে কঠিন অংশ নয়। আসল কঠিন কাজ হল ফাইল বোঝা। একজন জেলাশাসক যখন ১৭ পাতার নোট পাঠান, তার মধ্যে কোথায় ফাঁদ, কোথায় ঝুঁকি, কোথায় আইনি জটিলতা তা বুঝতে বছর লেগে যায়। নতুন মন্ত্রীরা এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।

অবশ্য বিজেপির সমর্থকদের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিজ্ঞ লোকেরাই প্রশাসন চালিয়েছেন। ফল কী হয়েছে, তা মানুষ দেখেছে। সুতরাং “অভিজ্ঞতা” শব্দটা সবসময় দক্ষতার সমার্থক নয়। অনেক সময় নতুন লোক পুরনো ব্যবস্থাকে বেশি নাড়াতে পারেন।

এই যুক্তির রাজনৈতিক ওজন আছে। কারণ ভোটাররা যখন সরকার বদলান, তখন তাঁরা শুধু মুখ বদলাতে চান না — তাঁরা প্রায়ই প্রশাসনিক সংস্কৃতিও বদলাতে চান। এই মন্ত্রিসভা সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থ, পূর্ত, কৃষি, শিল্প, এই দফতরগুলো কি ট্রেনিং গ্রাউন্ড? নাকি এখানে প্রথম দিন থেকেই ফল দিতে হয়? একজন নতুন ক্রিকেটারকে রঞ্জি ট্রফিতে নামানো যায়, কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালে? পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প বিনিয়োগ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন — সবকিছু মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ, তা কোনও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ শিবির নয়। এখানে ভুলের মূল্য অনেক বেশি।

তবে এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। এখানে প্রায় প্রত্যেকেই নিজেকে প্রমাণ করতে মরিয়া। পুরনো সরকারে বহু মন্ত্রী অভিযোগ করতেন যে সমস্ত সিদ্ধান্ত এক বা দুই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। নতুন মন্ত্রীরা সেই মানসিকতা নিয়ে আসেননি। তাঁরা জানেন, তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আগামী এক-দেড় বছরের পারফরম্যান্সের উপর। ফলে প্রশাসনে এক ধরনের আগ্রাসী উদ্যম দেখা যেতে পারে।

অবশ্য উদ্যম আর দক্ষতা এক জিনিস নয়। অনেক সময় অতিরিক্ত উৎসাহও বিপজ্জনক বিশেষ করে যখন কোনও মন্ত্রী প্রথম সপ্তাহেই পাঁচটি কমিটি, সাতটি তদন্ত এবং বারোটি “জরুরি বৈঠক” ডেকে ফেলেন। নবান্নের প্রবীণ কর্মীরা তাই নাকি মজা করে বলছেন — “আগের সরকারে সমস্যা ছিল ফাইল নড়ত না। এবার সমস্যা হবে, ফাইল এত নড়বে যে ধরা যাবে না।”

সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভা এক বিরল রাজনৈতিক পরীক্ষা। এটি অভিজ্ঞতার মন্ত্রিসভা নয়, এটি প্রতিনিধিত্বের মন্ত্রিসভা। এটি প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিষ্ঠিত দল নয়, এটি রাজনৈতিক নবাগতদের ব্রিগেড। এখানে কেউ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নন, কেউ বহুবারের মন্ত্রী নন, কেউ প্রশাসনিক কিংবদন্তিও নন।

তাই এই মন্ত্রিসভার সাফল্য হলে তা হবে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির উদাহরণ। ব্যর্থ হলে তা প্রমাণ করবে যে সরকার চালানো আর সরকারবিরোধী আন্দোলন করা এক জিনিস নয়।

এই মুহূর্তে নবান্নের অবস্থা অনেকটা নতুন স্কুলের প্রথম দিনের মতো। সবাই নতুন ইউনিফর্ম পরে এসেছে, সবাই উচ্ছ্বসিত, সবাই আত্মবিশ্বাসী। শুধু একটা ছোট সমস্যা আছে — ক্লাস শুরু হয়েছে এবং এখন প্রশ্নপত্র সামনে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles