Table of Contents
ম্যাসাচুসেটস ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের আকাশে জ্বলে উঠল বিশাল অগ্নিগোলক, বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল ঘরবাড়ি
ওয়েব ডেস্ক | ১ জুন ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আকাশে একটি উল্কাপিণ্ড বিস্ফোরিত হয়ে প্রায় ৩০০ টন টিএনটির সমপরিমাণ শক্তি মুক্ত করেছে। বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ বহু কিলোমিটার দূর পর্যন্ত শোনা যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার, ৩০ মে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে, বিকেল ২টা ৬ মিনিটে উত্তর-পূর্ব ম্যাসাচুসেটস এবং দক্ষিণ-পূর্ব নিউ হ্যাম্পশায়ারের আকাশে একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলক বা ‘ফায়ারবল’ দেখা যায়। সেটিই ছিল পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা একটি উল্কাপিণ্ড, যা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর ভেঙে বিস্ফোরিত হয়।
নাসার উপ-সংবাদপ্রধান জেনিফার ডোরেন এক বিবৃতিতে বলেন, “এই অগ্নিগোলকটি কোনও সক্রিয় উল্কাবৃষ্টির অংশ ছিল না। এটি ছিল একটি প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তু। এটি কোনও মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ, উপগ্রহ বা পুনঃপ্রবেশকারী মহাকাশ আবর্জনা ছিল না।”
তিনি আরও জানান, উল্কাপিণ্ডটি ভেঙে যাওয়ার সময় যে শক্তি নির্গত হয়েছিল, তার পরিমাণ আনুমানিক ৩০০ মেট্রিক টন টিএনটির সমান। সেই কারণেই এত প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল।
ঘণ্টায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বেগ
নাসার তথ্য অনুযায়ী, উল্কাপিণ্ডটি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন তার গতি ছিল ঘণ্টায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে সেটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে বহু মানুষ জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে বাড়িঘর কেঁপে উঠেছিল। কেউ কেউ প্রথমে ভেবেছিলেন ভূমিকম্প হয়েছে, আবার অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন কোনও বিমান দুর্ঘটনা বা সামরিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে আকাশ জুড়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাওয়া এক উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি মিলিয়ে যায়, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে শোনা যায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ।
কেন ঘটে এমন বিস্ফোরণ?
বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশ থেকে আসা ছোট-বড় পাথুরে বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে বায়ুর সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে সেগুলি অত্যন্ত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। তবে বড় আকারের বস্তু হলে তা ভেঙে বিস্ফোরিত হতে পারে এবং তীব্র শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে।
এই ধরনের উজ্জ্বল আলোকময় ঘটনাকে সাধারণত ‘ফায়ারবল’ বলা হয়। এগুলি সাধারণ উল্কার তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং শক্তিশালী।
চেলিয়াবিনস্কের স্মৃতি ফিরিয়ে দিল এই ঘটনা
যদিও এবারের বিস্ফোরণটি উল্লেখযোগ্য, তবে ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত উল্কাবিস্ফোরণগুলির তুলনায় এটি অনেক ছোট।
২০১৩ সালে রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্ক শহরের আকাশে একটি বিশাল উল্কাপিণ্ড বিস্ফোরিত হয়েছিল। বাড়ির সমান আকারের সেই মহাজাগতিক পাথরটি ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার উচ্চতায় ভেঙে যায় এবং তার বিস্ফোরণশক্তি ছিল ৪ লক্ষ ৪০ হাজার টন টিএনটির সমান।
সেই বিস্ফোরণের অভিঘাতে প্রায় ৫১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ১,৬০০-রও বেশি মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই কাচের টুকরোয় জখম হয়েছিলেন।
তার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘটনাটি অনেক কম শক্তিশালী হলেও, এটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল প্রতিনিয়ত মহাকাশ থেকে আসা বস্তুগুলির আঘাত সামলাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলি আমাদের অজান্তেই পুড়ে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনও উল্কাপিণ্ড এমন নাটকীয় উপস্থিতি জানিয়ে দেয় যে কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশই হয়ে ওঠে এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মঞ্চ।