হাইলাইটস:
- সোনারপুরে কিছু মানুষ বিক্ষোভ দেখালেন।
- ঘটনাটি পরে পরিণত হল আন্তর্জাতিক মানের গুপ্তহত্যা-চক্রান্তে।
- কয়েক ডজন মানুষের স্লোগান থেকে তৈরি হল এক মহাকাব্যিক ষড়যন্ত্রের কাহিনি।
- এবং যথারীতি, এর পিছনে ছিল ‘বাইরে থেকে আনা লোক’— ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় অতিপ্রাকৃত প্রাণী।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হল, এখানে বাস্তব ঘটনা খুব সাধারণ। অথচ নেতারা সাধারণ ঘটনা পছন্দ করেন না। তাঁদের চাই মহাকাব্য, মহাভারত, বিশ্বযুদ্ধ, রাষ্ট্রদ্রোহ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, অন্ততপক্ষে সিআইএ-মোসাদ-আইএসআইয়ের সম্মিলিত অপারেশন।
সোনারপুরে যা ঘটেছিল, তা খুব সাধারণ একটি ঘটনা ছিল। একজন রাজনৈতিক নেতা একজন মৃতের বাড়িতে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, করতে গেলেন। কিছু মানুষ প্রতিবাদ করলেন। কেউ স্লোগান দিলেন। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। কেউ হয়তো খুব ভদ্রতা করলেন না। মোট কথা, গণতন্ত্রে যা হয়।
কিন্তু সমস্যা হল, এই ব্যাখ্যায় কোনও রোমাঞ্চ নেই। তাই ঘটনাটিকে দ্রুত উন্নীত করা হল চ্ক্রান্তের তত্ত্বে।।কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোনারপুর আর সোনারপুর রইল না। সেটি হয়ে গেল রাজনৈতিক থ্রিলার ছবির সেট। সেখানে নাকি বাইরে থেকে লোক আনা হয়েছিল।
এই ‘বাইরে থেকে লোক’ কথাটি ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ধারণাগুলির একটি। যখন কোনও সভায় লোক কম হয়, তখন বলা হয় মানুষ আসতে পারেনি। যখন কোনও সভায় লোক বেশি হয়, তখন বলা হয় বাইরে থেকে আনা হয়েছে। যখন সমর্থক আসে, তারা জনতা। যখন বিরোধী আসে, তারা বহিরাগত। এই যুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোথাও না কোথাও বহিরাগত।
প্রশ্ন হচ্ছে, সোনারপুরে যাঁরা বিক্ষোভ করেছিলেন, তাঁরা কোথা থেকে এসেছিলেন? মঙ্গল গ্রহ থেকে? শুক্র গ্রহ থেকে? নাকি নাসা বিশেষ বিমানে করে তাঁদের নামিয়ে দিয়েছিল?
অদ্ভুত ব্যাপার হল, পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশক ধরে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনায় এই রহস্যময় “বাইরে থেকে আনা লোক” দেখা যায়। কিন্তু তাদের কোনওদিন ধরা যায় না। তাদের নাম জানা যায় না। তাদের বাড়ি কোথায় জানা যায় না। তাদের ভোটার কার্ড পাওয়া যায় না।
তারা এক ধরনের রাজনৈতিক ভূত। ঘটনার সময় হাজির হয়, তারপর উধাও হয়ে যায়। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তারা সবসময় বিরোধীদের পক্ষেই কাজ করে।
আরও মজার দাবি হল, এটি নাকি হত্যার ষড়যন্ত্র ছিল। এখানে এসে কাহিনি সত্যিই হলিউডের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কারণ হত্যার ষড়যন্ত্র বলতে সাধারণ মানুষ যা বোঝে, তার সঙ্গে সোনারপুরের ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। সাধারণত হত্যার ষড়যন্ত্রে অস্ত্র থাকে। পরিকল্পনা থাকে। গোপন বৈঠক থাকে। যোগাযোগের নেটওয়ার্ক থাকে। পালানোর ব্যবস্থা থাকে। সোনারপুরে দেখা গেল স্লোগান আছে, উত্তেজনা আছে, বিশৃঙ্খলা আছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের সেই ক্লাসিক উপাদানগুলি কোথায়?
অবশ্য আধুনিক রাজনীতিতে প্রমাণের দরকার হয় না।ঘটনা যত ছোট, বয়ান তত বড়।
একটা জুতো উড়ে গেলে বলা হয় গণতন্ত্র আক্রান্ত। একটা স্লোগান উঠলে বলা হয় সংবিধান বিপন্ন। দশজন মানুষ বিক্ষোভ করলে বলা হয় রাষ্ট্র উৎখাতের চেষ্টা চলছে। সোনারপুরের ঘটনাও সেই ধারার উত্তরাধিকারী।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি সত্যিই এত বড় হত্যার চক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার তদন্ত কোথায়? কারা পরিকল্পনা করেছিল? কোথায় বৈঠক হয়েছিল? কারা অর্থ জুগিয়েছিল? কারা নির্দেশ দিয়েছিল? কাদের গ্রেফতার করা হয়েছে? কোথায় সেই প্রমাণ? নাকি ষড়যন্ত্রের একমাত্র প্রমাণ হল বক্তৃতামঞ্চে উচ্চারিত কয়েকটি বাক্য? রাজনীতির এক নতুন বিজ্ঞান তৈরি হয়েছে।
এই বিজ্ঞানে অভিযোগই প্রমাণ। অনুভূতিই তথ্য। আর বক্তৃতাই ফরেনসিক রিপোর্ট। আসলে সমস্যা অন্য জায়গায়। অনেক দিন ক্ষমতায় থাকলে একটি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। মানুষের সমর্থনকে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু মানুষের অসন্তোষকে অস্বাভাবিক মনে হয়। প্রশংসা হল বাস্তবতা। প্রতিবাদ হল ষড়যন্ত্র। তালি হল জনগণের মতামত। কিন্তু শিস হল বহিরাগতদের কাজ।
এই মানসিকতা শুধু বাংলায় নয়, পৃথিবীর নানা জায়গায় দেখা গেছে। ক্ষমতার দীর্ঘ করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক নেতা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে জনগণ তাঁদের ভালবাসতেই বাধ্য। ফলে যখন কেউ ভালবাসতে অস্বীকার করে, তখন সেটি রাজনৈতিক মতভেদ নয়, অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
সোনারপুরের ঘটনায় সবচেয়ে বড় অসুবিধা সম্ভবত এই যে, ঘটনাটি খুব মানবিক। সেখানে কিছু মানুষ তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেন করেছেন, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তাঁরা ঠিক না ভুল, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তাঁদের অস্তিত্বই অস্বীকার করা কঠিন। কারণ গণতন্ত্রে মানুষ মাঝে মাঝে রেগে যায়। এবং তারা সেই রাগ প্রকাশও করে।
এই সরল সত্যটি মেনে নেওয়ার চেয়ে ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ তত্ত্ব অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কারণ তাতে আত্মসমালোচনার দরকার হয় না। নিজের জনপ্রিয়তা কমছে কিনা তা ভাবতে হয় না। সংগঠনের দুর্বলতা দেখতে হয় না। শুধু বলতে হয়—“সব সাজানো।”
এবং রাজনীতির ইতিহাসে “সব সাজানো” সম্ভবত সবচেয়ে আরামদায়ক ব্যাখ্যা।