বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীর ভান্ডার চালু হওয়ার পর থেকেই এর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সরলতা। খুব বেশি জটিলতা ছাড়াই বিপুল সংখ্যক মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় এসেছেন। কিন্তু বিজেপির প্রস্তাবিত অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্ম সামনে আসার পর স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, নতুন প্রকল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইছে। এখানে শুধু আবেদনকারী মহিলার পরিচয় জানলেই হবে না; গোটা পরিবারের আর্থিক, সামাজিক এবং সম্পত্তিগত অবস্থার বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—লক্ষ্মীর ভান্ডারের তুলনায় অন্নপূর্ণা যোজনার কোন কোন শর্ত বাস্তবে বেশি কঠোর?

সবচেয়ে বড় পার্থক্য শুরু হচ্ছে আবেদনপত্রের আকার থেকেই।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের ফর্ম তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজবোধ্য। সেখানে মূলত আবেদনকারী মহিলার পরিচয়, বয়স, রেশন কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং কিছু মৌলিক তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম ১১ পাতার। এই দীর্ঘ ফর্মই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরকার অনেক বেশি গভীর যাচাই করতে চাইছে।

প্রথম কঠোরতা হল পরিবারভিত্তিক পূর্ণ তথ্য প্রদান।

লক্ষ্মীর ভান্ডারে মূল গুরুত্ব আবেদনকারী মহিলার ওপর। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নাম, বয়স, আধার নম্বর, ভোটার তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পেশা সব কিছু দিতে হবে। অর্থাৎ একজন মহিলা আবেদন করলেও কার্যত পুরো পরিবার প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের আওতায় চলে আসছে।

দ্বিতীয় কঠোরতা হল সম্পত্তি যাচাই।

লক্ষ্মীর ভান্ডারে সাধারণভাবে কিছু শ্রেণিকে বাদ দেওয়া হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমি বা বাড়ির সূক্ষ্ম তথ্য নিয়ে এত গভীর অনুসন্ধান হয় না। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনায় জমির পরিমাণ, বাড়ির ধরন, মিউটেশন, রেজিস্ট্রি এসব তথ্য চাওয়া হচ্ছে। ফলে যাদের সামান্য সম্পত্তি আছে কিন্তু নগদ আয় কম, তারাও সমস্যায় পড়তে পারেন।

তৃতীয় কঠোরতা হল ব্যাংকিং নজরদারি।

লক্ষ্মীর ভান্ডারে আবেদনকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই মূলত যথেষ্ট। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনায় পরিবারের সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এর অর্থ সরকার পুরো পরিবারের আর্থিক কাঠামো বুঝতে চাইছে।

চতুর্থ কঠোরতা ভোটার তথ্য নিয়ে।

অন্নপূর্ণা ফর্মে শুধু ভোটার কার্ড নম্বর নয়, বিধানসভা কেন্দ্র ও পার্ট নম্বর পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। এর ফলে আবেদনকারীর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিচয় এবং স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া আরও কড়া ভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। লক্ষ্মীর ভান্ডারে এই স্তরের ভোটার-তথ্য বিশ্লেষণ এতটা গুরুত্ব পায় না।

পঞ্চম কঠোরতা হল অন্যান্য সরকারি সুবিধার তথ্য।

অন্নপূর্ণা যোজনায় জানতে চাওয়া হচ্ছে পরিবার ইতিমধ্যে আর কোন কোন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিমা আছে কি না, অন্য কোনও সামাজিক প্রকল্পে নাম রয়েছে কি না এসবও লিখতে হবে। অর্থাৎ সরকার overlapping benefits বা একাধিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা খতিয়ে দেখতে চাইছে।

ষষ্ঠ কঠোরতা হল প্যান কার্ড ও পেশাগত তথ্য।

লক্ষ্মীর ভান্ডারে বহু নিম্নবিত্ত পরিবার সহজেই আবেদন করতে পেরেছে কারণ সেখানে এর আর্থিক প্রোফাইলিং ছিল না। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনায় পরিবারের সদস্যদের পেশা, প্যান কার্ড, সম্ভাব্য আয় এসব তথ্যও চাওয়া হচ্ছে। ফলে “স্বঘোষিত দারিদ্র্য” যথেষ্ট হবে না; সরকার নিজে আর্থিক সক্ষমতা বিচার করতে চাইবে।

সপ্তম কঠোরতা হল গাড়ি ও ভোগ্যসম্পদ যাচাই।

পরিবারের কারও চার চাকার গাড়ি আছে কি না, তাও জানাতে হবে। এই ধরনের তথ্য সাধারণত কল্যাণমূলক প্রকল্পের লক্ষ্য নির্ধারণ-এর ক্ষেত্রে সচ্ছলতার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিন্তু সামান্য সম্পদধারী পরিবারও বাদ পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের মূল দর্শন ছিল বিস্তৃত অন্তর্ভুক্তি। সরকার ধরে নিয়েছিল, খুব বেশি কঠোর ফিল্টার বসালে প্রকৃত দরিদ্রেরাও বাদ পড়ে যেতে পারেন। তাই আবেদন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ রাখা হয়েছিল।

অন্যদিকে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম দেখাচ্ছে বিজেপি অনেক বেশি “টার্গেটেড ওয়েলফেয়ার” মডেলের দিকে যেতে চাইছে। অর্থাৎ যাদের প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, শুধু তাদের বেছে নেওয়ার চেষ্টা।

কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।

কারণ বাংলার কল্যাণ রাজনীতিতে মানুষ শুধু টাকার পরিমাণ দেখেন না; তাঁরা দেখেন প্রকল্পটি কত সহজ, কত কম অপমানজনক, এবং কত কম ঝামেলাপূর্ণ। লক্ষ্মীর ভান্ডারের জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল—অল্প কাগজে, কম প্রশ্নে, নিয়মিত টাকা।

অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে যদি মানুষ মনে করেন যে অত্যধিক তথ্য, অতিরিক্ত যাচাই এবং বাদ পড়ার ভয় রয়েছে, তাহলে সেটি রাজনৈতিকভাবে উল্টে যেতে পারে। আবার বিজেপির যুক্তি হল রাষ্ট্রের অর্থ সঠিক মানুষের কাছেই পৌঁছনো উচিত।

ফলে বাস্তবে এই দুই প্রকল্পের লড়াই শুধু অর্থের নয়; এটি “সহজ অন্তর্ভুক্তি” বনাম “কঠোর বাছাই”-এরও সংঘর্ষ।