Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিচারব্যবস্থা (Indian Judiciary) বহুদিন ধরেই এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্ট এখনও সাধারণ মানুষের চোখে শেষ আশ্রয়স্থল—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের চূড়ান্ত প্রতিরোধ (Citizen Rights and Supreme Court)। অন্যদিকে, একই আদালতের কিছু বিচারপতির আচরণ, মন্তব্য এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় তাঁদের ভূমিকা (Supreme Court Controversy) ক্রমশ এমন এক সংকট তৈরি করছে, যা বিচারব্যবস্থার নৈতিক মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ এপিসোডিক ধারায়, অর্থাৎ একাধিক পর্বে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে। যা আপনি এখন পড়ছেন, এটি তার প্রথম পর্ব।
কোর্টরুম থেকে ট্রেন্ডিং: একটি ডিজিটাল বিদ্রোহের জন্ম
এই বিতর্কের কেন্দ্রে সাম্প্রতিক সময়ে উঠে এসেছেন ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের বিচারপতি সূর্যকান্ত। তাঁর একাধিক মন্তব্য—বিশেষত বেকার যুবকদের প্রসঙ্গে “ককরোচ” বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা (CJI Surya Kant cockroach remark row) এবং গুজরাটের এক বন্দর প্রকল্পের বিরোধিতাকারী পরিবেশকর্মীদের নিয়ে কটাক্ষ শুধু বিতর্কই তৈরি করেনি, বরং এক বিরল সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আগে এমন দেখা যায়নি।
“ককরোচ জনতা পার্টি” (Cockroach Janta Party controversy), একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেভাবে লক্ষ লক্ষ তরুণের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাজনৈতিক বীতশ্রদ্ধতার প্রতীক হয়ে উঠল, তা নিছক একটি ইন্টারনেট মিমের গল্প নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা এবং যুবসমাজের সম্পর্কের এক গভীর সংকেত।
প্রশ্ন উঠছে: বিচারপতি সূর্যকান্ত কি ব্যক্তিগতভাবে বিতর্কিত? নাকি তিনি এমন এক বিচারিক সংস্কৃতির প্রতীক, যেখানে বিচারকেরা ধীরে ধীরে সংবিধানের নিরপেক্ষ রক্ষক থেকে রাষ্ট্রশক্তির নৈতিক মুখপাত্রে পরিণত হচ্ছেন?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। ভারতের ইতিহাসে এর পূর্বসূরিও আছে।
বিচারপতির ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একজন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির প্রতিটি শব্দ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশ। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি সংবিধানের কণ্ঠস্বর। ফলে তাঁর মন্তব্য ব্যক্তিগত মত নয়, তা আইনি ও নৈতিক সংকেত বহন করে।
ভারতের বিচারব্যবস্থায় বহু বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ অতীতে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে “ওরাল অবজার্ভেশনস” বা শুনানি চলাকালীন বিচারকদের তাৎক্ষণিক মন্তব্য এমনভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে যে, সেগুলি কার্যত রায়ের সমান রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করছে।
সমস্যা হল, এই মন্তব্যগুলির অধিকাংশই পরে লিখিত রায়ে থাকে না। অর্থাৎ বিচারক রাজনৈতিক সংকেত দিলেন, জনমত প্রভাবিত করলেন, সংবাদচক্র নিয়ন্ত্রণ করলেন কিন্তু তাঁর কথার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায় রইল না।
এই প্রবণতা এখন ভয়াবহ মাত্রা নিচ্ছে।
বেকার যুবকদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করা নিছক অসাবধানতা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় অভিজাত শ্রেণির এক গভীর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ যেখানে প্রতিবাদী, বঞ্চিত বা হতাশ নাগরিককে নাগরিক হিসেবে নয়, বিরক্তিকর জনসমষ্টি হিসেবে দেখা হয়।
ভারতের যুবসমাজ যখন চাকরির সংকট, পরীক্ষায় দুর্নীতি, নিয়োগ বাতিল, পেপার লিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় জর্জরিত, তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকের কাছ থেকে সহানুভূতি নয়, অবজ্ঞা শোনা এক বিশাল প্রতীকী ধাক্কা।
এই কারণেই “ককরোচ জনতা পার্টি” শুধুমাত্র ব্যঙ্গ ছিল না। এটি ছিল সম্মানহানির বিরুদ্ধে ডিজিটাল বিদ্রোহ।
আদালত নাকি রাষ্ট্রের সম্প্রসারিত শাখা?
ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নামগুলির একটি হল এ.এন.রায়।
১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ভারতের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন, তিনজন সিনিয়র বিচারপতিকে উপেক্ষা করে। কারণ? কেশবানন্দ ভারতী মামলায় “বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন” প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এ এন রায়। অর্থাৎ তিনি কার্যত সরকারের পছন্দসই বিচারিক অবস্থান নিয়েছিলেন।
এই নিয়োগ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর এক ঐতিহাসিক আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
পরবর্তীতে জরুরি অবস্থার সময় কুখ্যাত এডিএম জবলপুর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখাকে সমর্থন করল, তখন বিচারব্যবস্থার নৈতিক পতন সম্পূর্ণ হয়ে যায়। সেই রায়ে বিচারপতি এইচ আর খান্না একমাত্র ভিন্নমত দিয়েছিলেন। বাকিরা কার্যত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সামনে আত্মসমর্পণ করেন।
আজ যখন সূর্যকান্তের মতো বিচারকদের ঘিরে বিতর্ক ওঠে, তখন সেই অতীত ফিরে আসে। কারণ ভারতীয় গণতন্ত্রে বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভয় সবসময় একটাই—সরকারের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য।
বিচারক যদি রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, তবে নাগরিক কোথায় যাবে?
পরিবেশ আন্দোলন বনাম “উন্নয়ন”
গুজরাটের বন্দর প্রকল্প নিয়ে পরিবেশকর্মীদের উদ্দেশে বিচারপতি সূর্যকান্তের মন্তব্যও একইভাবে বিতর্ক উসকে দেয়। অবসরপ্রাপ্ত আমলা, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান।
কারণ বিষয়টি শুধুমাত্র একটি প্রকল্প নয়।
ভারতে গত এক দশকে “ডেভেলপমেন্ট ভার্সাস অবস্ট্রাকশন” নামে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় ভাষা তৈরি হয়েছে। যে কেউ পরিবেশ, আদিবাসী অধিকার, বনভূমি বা উপকূলরক্ষার প্রশ্ন তুলছেন, তাঁকে প্রায়শই “অ্যান্টি-ডেভেলপমেন্ট”, “আরবান নকশাল”, “ফরেন-ফান্ডেড অ্যাক্টিভিস্ট” ইত্যাদি তকমা দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই ভাষা এখন আদালতের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে।
সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিকভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। গঙ্গা দূষণ, দিল্লির বায়ুদূষণ, বনরক্ষা—বহু ক্ষেত্রে আদালত কার্যকর হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৃহৎ কর্পোরেট বা রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে আদালতের মনোভাব বদলাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
যখন বিচারপতি পরিবেশকর্মীদের প্রায় বিদ্রূপের সুরে আক্রমণ করেন, তখন নাগরিক সমাজের আশঙ্কা হয়—আদালত কি আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী থাকছে না?
বিচারপতিদের “স্টার সংস্কৃতি”
ভারতের বিচারব্যবস্থায় আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে—বিচারকদের সেলিব্রিটি হয়ে ওঠা।
আগে বিচারপতিরা প্রায় অদৃশ্য থাকতেন। তাঁদের রায় কথা বলত। এখন অনেক বিচারপতি সংবাদশিরোনামের কেন্দ্রে। শুনানির সময় দেওয়া মন্তব্য, তির্যক রসিকতা, রাজনৈতিক ইঙ্গিত, সবই ভাইরাল হচ্ছে।
টেলিভিশন মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়েছে।
ফলে এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে: “পারফরমেটিভ জাজিং”।
অর্থাৎ বিচারক কখনও কখনও আদালতের ভেতরে শুধু আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করছেন না; তিনি বৃহত্তর জনতার উদ্দেশে রাজনৈতিক বা নৈতিক নাটকও মঞ্চস্থ করছেন।
এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কারণ বিচারব্যবস্থার শক্তি তার সংযমে। বিচারক যত কম ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করবেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা তত বেশি থাকবে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফেলিক্স ফ্র্যাঙ্কফার্টার একবার বলেছিলেন, “দ্য কোর্ট’স অথরিটি ডিপেন্ডস অন পাবলিক কনফিডেন্স ইন ইটস মোরাল স্যাংশন।”
সেই মোরাল স্যাংশন ক্ষয়ে যায় যখন বিচারক রাজনৈতিক ভাষ্যকারের মতো আচরণ করতে শুরু করেন।
আদালতের ভাষা এবং গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য
একটি গণতন্ত্রে আদালতের ভূমিকা কী?
সরকারকে খুশি করা নয়। জনতার আবেগকে তুষ্ট করা নয়। সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া নয়।
আদালতের কাজ হল সংবিধানকে রক্ষা করা, বিশেষত তখন, যখন তা অজনপ্রিয় বা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।
কিন্তু ভারতের বিচারব্যবস্থায় এখন এমন এক মুহূর্ত এসেছে, যেখানে নাগরিকদের একাংশ মনে করছেন আদালত আর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ক্ষমতার নৈতিক বৈধতা তৈরির অংশ।
এই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, তার অস্তিত্বই ভয়ঙ্কর।
কারণ বিচারব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেনাবাহিনীর মতো তার অস্ত্র নেই, সরকারের মতো প্রশাসন নেই। তার একমাত্র শক্তি জনআস্থা।
যদি সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেন যে বিচারপতিরা নাগরিকের কষ্ট বোঝেন না, বেকারত্বকে বিদ্রূপ করেন, পরিবেশ আন্দোলনকে তুচ্ছ করেন, বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্য রাখেন, তবে সেই আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
আর বিচারব্যবস্থার সংকট শুরু হয় সেখান থেকেই।
চলবে…