Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারত এখনও বহুজাতিক সংস্থাগুলির বৈশ্বিক কার্যক্রমের এক কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এমন এক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা দেশের প্রায় ৩১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি পরিষেবা শিল্পকে চালিত করে আসা বহু দশকের পুরনো আউটসোর্সিং মডেলটিকেই (outsourcing model) নতুন করে লিখে দিতে পারে।
এই বিষয়টিই ছিল রয়টার্স ইন্ডিয়া সামিটের (Reuters India Summit) আলোচনার একেবারে কেন্দ্রে। সেখানে উপস্থিত বহুজাতিক সংস্থার কর্তারা ব্যাপক হারে কর্মী নিয়োগের বদলে উৎপাদনশীলতা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিয়োগের ওপর বেশি জোর দেন।
কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, লক্ষ্য এখন উৎপাদনশীলতা
বৃহৎ দক্ষ কর্মীভান্ডার এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে ভারত বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের নানা প্রান্তের সংস্থাই এখনও ভারতে নিজেদের কার্যক্রম বাড়িয়ে চলেছে। তবে কর্তারাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আগামী দিনের বিস্তার আর কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না। বরং তা নির্ধারিত হবে এআই-নির্ভর উৎপাদনশীলতা এবং বিশেষায়িত কাজের মাধ্যমে।
নোভো নরডিস্ক সামিটে জানিয়েছে, তারা ওষুধ বাজারে আনার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এআই (AI) ব্যবহার করছে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক কার্যক্রমে ভারতের ভূমিকাও বাড়াচ্ছে। কিন্তু কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা “সতর্ক ও সংযত” অবস্থানই নেবে বলে জানিয়েছে।
ডাইমলার ট্রাকে এআই-ভিত্তিক সরঞ্জাম ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের “আরও দ্রুত মেধাস্বত্ব তৈরি করতে” সাহায্য করছে। সংস্থাটি এখন এআই (AI), সাইবার নিরাপত্তা (cyber security) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির (digital technology) মতো ক্ষেত্রগুলিতে “বিশেষ ধরনের দক্ষ কর্মী” খুঁজছে।
পাবলিসিস গোষ্ঠীর প্রযুক্তি ও বিপণন পরিষেবা শাখা এপসিলন জানিয়েছে, এআই (AI) উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও কর্মীসংখ্যা মোটামুটি একই রয়েছে।
এপসিলন ইন্ডিয়া-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রতীক নাথ বলেন, “যা বদলেছে তা হল, আমরা কতটা কাজ সরবরাহ করছি এবং নতুন কী কী দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।”
সংস্থাগুলিকে বৈশ্বিক পরিষেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাএবং পরিচালনায় সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান এএনএসআর-এর সিইও ললিত আহুজা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের সংখ্যার নিরিখে ভারতে এই কেন্দ্রগুলির বৃদ্ধি ও বিস্তার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্থর হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, “সংস্থাগুলি এখন অনেক কম লোক নিয়োগ করছে, মূলত অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে।”
স্থায়ী নিয়োগে রাশ, চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সড কর্মীবাহিনীর উত্থান
এই পরিবর্তন শুধু স্থায়ী কর্মী নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নেই। এআই-কে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় ভারতীয় সংস্থাগুলি ক্রমশ চুক্তিভিত্তিক এবং আউটসোর্সড কর্মী ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
টিমলিজ সার্ভিসেস (TeamLease Services) সংস্থার প্রধান কৌশল আধিকারিক পি সুব্বরাথিনম বলেন, “সংস্থাগুলি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী খরচের বিষয়ে আরও সতর্ক হয়ে উঠছে।” সংস্থার সিএফও রামানি দাথি জানান, বহু সংস্থাকেই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা “নিজেদের মোট কর্মীবাহিনীর ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত আউটসোর্সড বা পরিবর্তনশীল মডেলে রাখে।”
বিশ্বজুড়ে এই পরিবর্তনের চিত্র আরও স্পষ্ট। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড (Standard Chartered Bank) এআই-এ বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সাত হাজারেরও বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে। সংস্থার সিইও বিল উইন্টার্স বলেন, “এটা খরচ কমানোর বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে কম মূল্যমানের মানবসম্পদকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।”
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ব্যাঙ্কটির ব্যাক-অফিস কেন্দ্রগুলিতে, যার মধ্যে রয়েছে চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরু— বহুজাতিক সংস্থাগুলির জন্য ভারতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলির দু’টি।
কর্মীদের দক্ষতা নিয়ে নিয়োগকারী সংস্থার চাহিদায় পরিবর্তন
সংস্থাগুলির তরফে কর্মীদের দক্ষতা সম্পর্কে চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে পালটে যাচ্ছে। কিম্বার্লি-ক্লার্ক জানিয়েছে, এখন কর্মীদের শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকলেই চলে না, তাদের ক্ষেত্রবিশেষে গভীর দক্ষতার পাশাপাশি এআই (AI) সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা জরুরি, কারণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ক্রমশ নিয়মিত কোডিং-এর কাজ সামলে নিচ্ছে।
যে সব সংস্থা এখনও চিরাচরিত কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা বহাল রেখেছে, তারাও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, পুরনো আউটসোর্সিং মডেল দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
প্রথাগত ব্যাক-অফিস থেকে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার পথে যাত্রা
সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স (Southwest Airlines) আগামী কয়েক বছরে তাদের হায়দরাবাদ প্রযুক্তি কেন্দ্রের কর্মীসংখ্যা প্রায় এক হাজারে নিয়ে যেতে চায়। তবে সংস্থাটির উদ্ভাবন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ভারতীয় শাখার প্রধান কৃষ্ণ কল্লেপল্লি বলেছেন, এই নতুন অফিসকে তাঁরা ঐতিহ্যগত ব্যাক-অফিস কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান না।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু পুরনো কাজ তুলে এনে আর একটা ব্যাক-অফিস তৈরি করতে চাই না। আমরা এমন ব্যবসায়িক সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাই, যা প্রযুক্তিনির্ভর।”
বার্তাটি স্পষ্ট— ভারত এখনও বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই বহু পুরনো সম্পর্ক দ্রুত বদলে দিচ্ছে এআই (AI), যেখানে পূর্বতন ব্যবস্থায়, ব্যবসা বৃদ্ধি মানেই ছিল আরও বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা।