Home খবর তেলের বাজারে যুদ্ধের মেঘ: কোন কৌশলে হবে টাকার মানরক্ষা?

তেলের বাজারে যুদ্ধের মেঘ: কোন কৌশলে হবে টাকার মানরক্ষা?

0 comments 12 views
A+A-
Reset

Table of Contents

বাংলাস্ফিয়ার: পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের গন্ধ ছড়ালেই ভারতের অর্থনীতিতে এক পুরনো আতঙ্ক ফিরে আসে—তেলের দাম। আর তেলের দাম বাড়লেই ফিরে আসে আর এক পুরনো প্রশ্ন: ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কি টাকার মান রক্ষা করতে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার খরচ করবে, নাকি বাজারকে নিজের মতো চলতে দেবে?

প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মে সেটি আবার জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন ভারতের অর্থনীতি বাইরে থেকে দেখতে শক্তিশালী হলেও ভিতরে ভিতরে কয়েকটি চাপ একসঙ্গে জমতে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে। ডলার শক্তিশালী হচ্ছে। বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে অর্থ সরাচ্ছেন। আর ভারত, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে, সেই অভিঘাতের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার: ভারতের আর্থিক দুর্গ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর

গত কয়েক বছরে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাসের উৎস ছিল দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার। এক সময় যা ৬৮০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, সেটিকে ভারত এক ধরনের আর্থিক দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করত। এই রিজার্ভ শুধু আমদানি মেটানোর জন্য নয়; এটি ছিল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা—ভারত দুর্বল নয়, ভারত প্রস্তুত।

কিন্তু যুদ্ধ, জ্বালানি-দাম এবং মূলধনের অনিশ্চিত প্রবাহের যুগে সেই দুর্গও হঠাৎ অজেয় বলে মনে হচ্ছে না।

এখানেই শুরু হচ্ছে বিতর্ক। RBI কি বাজারে ডলার বিক্রি করে টাকার পতন থামাবে? নাকি রুপিকে পড়তে দেবে, যাতে অর্থনীতি নিজের ভারসাম্য নিজেই খুঁজে নিতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মুদ্রানীতির নয়; এটি ভারতের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন।

‘ম্যানেজড ফ্লোট’ নীতি এবং অদৃশ্য লাল দাগের টানাপোড়েন

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত “ম্যানেজড ফ্লোট” বা পরিচালিত ভাসমান বিনিময় হার নীতিতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে টাকার একটি নির্দিষ্ট মান ঘোষণা করে না, কিন্তু বাজারে অতিরিক্ত ওঠানামা হলে হস্তক্ষেপ করে। RBI কখনও প্রকাশ্যে বলে না তারা কোন স্তর রক্ষা করছে। কিন্তু মুদ্রাবাজারে সক্রিয় ট্রেডাররা জানেন, কিছু “অদৃশ্য লাল দাগ” আছে।

সমস্যা হল, ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের সময় সেই লাল দাগ রক্ষা করা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

ধরা যাক, উপসাগরীয় সঙ্কটের ফলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছল। ভারতের আমদানি বিল হঠাৎ ফুলে উঠবে। তেল কোম্পানিগুলিকে আরও বেশি ডলার কিনতে হবে। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে আশ্রয় নেন, তাহলে ভারতীয় বাজার থেকে ডলার বেরিয়ে যাবে। ফলাফল: রুপির উপর দ্বিমুখী চাপ।

কৃত্রিম প্রতিরোধ বনাম অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতির রাজনীতি

এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রথম প্রবৃত্তি সাধারণত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। কারণ দ্রুত মুদ্রাপতন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি করে। দুর্বল রুপি মানে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি। পেট্রল-ডিজেল, রান্নার গ্যাস, সার, শিল্পের কাঁচামাল—সবকিছুর দাম বাড়ে। মধ্যবিত্ত ক্ষুব্ধ হয়। সরকার চাপে পড়ে। সংবাদমাধ্যম “রুপির রেকর্ড পতন” নিয়ে শিরোনাম করে। তাই RBI প্রায়শই বাজারে ডলার বিক্রি করে আতঙ্ক কমানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু এখানেই একটি গভীর দ্বন্দ্ব আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক কি বাজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে পারে?

অর্থনৈতিক ইতিহাস বলছে, খুব কম ক্ষেত্রেই পারে।

১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সঙ্কট থেকে শুরু করে ২০২২ সালে জাপানের ইয়েন রক্ষার ব্যর্থ প্রচেষ্টা—বিশ্বজুড়ে বহু উদাহরণ আছে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বিপুল রিজার্ভ খরচ করেও শেষ পর্যন্ত বাজারের শক্তির কাছে নতি স্বীকার করেছে। কারণ, মুদ্রার মান শেষ পর্যন্ত শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় বাণিজ্য ঘাটতি, মূলধন প্রবাহ, সুদের হার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার মতো বৃহত্তর শক্তির দ্বারা।

দুর্বল রুপি কি সত্যিই দুর্বল অর্থনীতির লক্ষণ?

ভারতের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। বরং অনেক অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেন, নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাপতন কখনও কখনও অর্থনীতির জন্য উপকারী। রুপি দুর্বল হলে আমদানি কমে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতামূলক হয়। আইটি পরিষেবা, ওষুধ, টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের মতো খাত লাভবান হতে পারে। বিদেশে থাকা ভারতীয়দের পাঠানো রেমিট্যান্সের মূল্যও বাড়ে।

অর্থাৎ দুর্বল রুপি সবসময় দুর্বল অর্থনীতির চিহ্ন নয়।

চীন বহু বছর ধরে প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারকে শিল্পনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। জাপানও দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল ইয়েনের সুবিধা নিয়েছে। এমনকি আমেরিকাও প্রায়শই “অতিরিক্ত শক্তিশালী ডলার”-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এসেছে।

ঐতিহাসিক ক্ষত: ১৯৯১ সালের স্মৃতির ছায়া

তাহলে ভারত কেন রুপির পতনকে এত ভয় পায়?

এর উত্তর আংশিকভাবে রাজনৈতিক, আংশিকভাবে ঐতিহাসিক।

১৯৯১ সালের ভারসাম্য-সংকট এখনও ভারতের নীতিনির্ধারকদের মানসপটে গভীরভাবে উপস্থিত। সেই সময় ভারতকে সোনা বন্ধক রেখে জরুরি ঋণ নিতে হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এতটাই কমে গিয়েছিল যে কয়েক সপ্তাহের আমদানি মেটানোর মতো ডলারও হাতে ছিল না। সেই অপমান জাতীয় অর্থনৈতিক স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

ফলে আজকের ভারত রিজার্ভকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখে না; দেখে সার্বভৌম মর্যাদার প্রতীক হিসেবে।

এ কারণেই RBI প্রায়শই “অতিরিক্ত অস্থিরতা” ঠেকানোর নামে বাজারে হস্তক্ষেপ করে। লক্ষ্য হয়তো নির্দিষ্ট বিনিময় হার রক্ষা করা নয়, বরং এই বার্তা দেওয়া যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।

বাজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ‘মরাল হ্যাজার্ড’-এর ঝুঁকি

কিন্তু এই কৌশলেরও মূল্য আছে।

রিজার্ভ খরচ মানে শুধু ডলার বিক্রি নয়। এর ফলে আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য কমে যেতে পারে। বন্ড মার্কেটে চাপ বাড়তে পারে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যদি বাজার বিশ্বাস করতে শুরু করে যে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একটি নির্দিষ্ট স্তর রক্ষা করতে মরিয়া, তাহলে জল্পনাকারীরা ঠিক সেই স্তরেই আক্রমণ শুরু করে।

জর্জ সোরোসের বিখ্যাত “ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড ভাঙা”-র কাহিনি এখানেই প্রাসঙ্গিক। যখন বাজার বুঝে যায় যে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি শক্তি দেখাতে চাইছে, তখন সেই প্রতিরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ভারতের জন্য তাই আসল প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত নয়, কৌশলগত।

RBI কি রুপির একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা রক্ষা করবে? নাকি শুধু বিশৃঙ্খলা ঠেকাবে?

দুই নীতির মধ্যে পার্থক্য সূক্ষ্ম, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হল প্রতিরক্ষা। দ্বিতীয়টি হল শক-অ্যাবজর্বার তৈরি করা। এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, সম্ভবত দ্বিতীয় পথটিই বেশি বাস্তবসম্মত।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও ভারতের কাঠামোগত দুর্বলতা

রুপির প্রশ্নে ভারতের সামনে আজ যে দ্বিধা, সেটি আসলে এক বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন। গত দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে বদলেছে যে “স্থিতিশীল বিনিময় হার” আর আগের মতো সরল নীতিগত লক্ষ্য নয়। এখন মুদ্রা শুধু বাণিজ্যের যন্ত্র নয়; এটি ভূরাজনীতি, মূলধনের গতিবিধি, যুদ্ধ, এমনকি মনস্তত্ত্বেরও অংশ।

পারস্য উপসাগরের সঙ্কট সেই বাস্তবতাকেই নগ্ন করে দিয়েছে।

ভারতের দুর্বলতা কোথায়, তা বোঝার জন্য প্রথমে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হবে: ভারত এখনও শক্তিশালী আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি। দেশটি সফটওয়্যার রপ্তানিতে বিশ্বশক্তি, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তায় এখনও বহুলাংশে বিদেশের উপর নির্ভরশীল। তেল, গ্যাস, কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-উপাদান—সবকিছুর জন্য ডলার লাগে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি ভূকম্পন ভারতের মুদ্রাবাজারে প্রতিধ্বনি তোলে।

বাঁধের রক্ষক এবং হট মানির (Hot Money) টানাপোড়েন

এই বাস্তবতায় RBI-র ভূমিকা অনেকটা বাঁধের রক্ষকের মতো। সমস্যা হল, বাঁধ কখন জল থামাবে আর কখন জল ছেড়ে দেবে, সেই সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে কঠিন।

যদি RBI রুপিকে অতিরিক্ত রক্ষা করতে চায়, তাহলে একটি বিপজ্জনক ফাঁদ তৈরি হতে পারে। বাজার ধীরে ধীরে ধরে নেবে যে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের একটি “অঘোষিত লক্ষ্য” আছে—ধরা যাক, ডলার-পিছু ৮৮ বা ৯০ টাকার আশেপাশে। তখন প্রতিটি আন্তর্জাতিক ধাক্কার সময় জল্পনাকারীরা সেই সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করবে। অর্থাৎ RBI-র বিরুদ্ধে এক ধরনের আর্থিক যুদ্ধ শুরু হবে।

এবং ইতিহাস বলছে, বাজারের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

বিশেষ করে আজকের বিশ্বে, যেখানে কয়েক সেকেন্ডে শত শত কোটি ডলার এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যেতে পারে।

তার উপর ভারতের আর-একটি জটিলতা আছে। দেশটি একদিকে বৈদেশিক মূলধন চায়, অন্যদিকে মুদ্রার স্থিতিশীলতাও চায়। কিন্তু এই দুই লক্ষ্য প্রায়ই পরস্পরের বিরোধী। কারণ, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা দ্রুত আসে এবং দ্রুত বেরিয়েও যায়। তারা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের কথা ভেবে অর্থ আনে না; তারা লাভের হিসাব করে।

যখন আমেরিকায় সুদের হার বাড়ে বা পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন সেই অর্থ নিরাপদ বন্দরে ফিরে যায়। ফলে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি হয়।

নির্দিষ্ট সংখ্যা রক্ষা নয়, লক্ষ্য হোক ‘প্যানিক ডায়নামিক্স’ ভাঙা

এই পরিস্থিতিতে RBI যদি রিজার্ভ ব্যবহার করে রুপিকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী রাখে, তাহলে এক ধরনের ভুল সংকেত তৈরি হতে পারে। আমদানিকারকরা ধরে নেবে যে ডলার সবসময় সহজলভ্য থাকবে। সরকার কঠিন সংস্কারের প্রয়োজন কম অনুভব করবে। অর্থনীতি ধীরে ধীরে বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারাবে।

অর্থনীতিবিদরা একে বলেন “moral hazard”—অর্থাৎ ঝুঁকির প্রকৃত মূল্য না দেওয়ার সংস্কৃতি।

অন্যদিকে, সম্পূর্ণ মুক্ত পতনও বিপজ্জনক।

কারণ ভারতের সমস্যা শুধু অর্থনীতির নয়; রাজনীতিরও। রুপির দ্রুত অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত দৃশ্যমান ঘটনা। স্টক মার্কেট পড়লে সবাই টের পান না, কিন্তু পেট্রলের দাম বাড়লে সবাই বোঝেন। ভারতীয় মধ্যবিত্তের কাছে শক্তিশালী রুপি অনেক সময় জাতীয় শক্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কাজ শুধু অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা নয়; প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণও।

এই কারণেই সম্ভবত RBI-র প্রকৃত কৌশল “রুপিকে বাঁচানো” নয়, বরং “পতনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা”।

অর্থাৎ বাজারকে পুরোপুরি আটকানো নয়, বরং আতঙ্ক ঠেকানো।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। যদি রুপি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়, বাজার সেটিকে অর্থনৈতিক সমন্বয় হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু যদি কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ তীব্র পতন ঘটে, তাহলে সেটি আস্থার সঙ্কটে পরিণত হয়। তখন আমদানিকারকরা ডলার মজুত করতে শুরু করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্রুত বেরিয়ে যায়। সাধারণ মানুষও সোনা বা ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

সুতরাং RBI-র প্রধান কাজ সম্ভবত নির্দিষ্ট সংখ্যা রক্ষা করা নয়; “panic dynamics” ভাঙা।

আজকের ভারতের শক্তি ও মধ্যপন্থার কৌশল

এখানে ভারতের একটি সুবিধাও আছে, যা ১৯৯১ সালে ছিল না।

আজকের ভারত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বহুমুখী অর্থনীতি। পরিষেবা রপ্তানি শক্তিশালী। প্রবাসী ভারতীয়দের রেমিট্যান্স বিপুল। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যথেষ্ট বড়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের অধিকাংশ সরকারি ঋণ নিজস্ব মুদ্রায়। ফলে অনেক লাতিন আমেরিকান বা আফ্রিকান দেশের মতো “ডলার ঋণের ফাঁদ”-এ ভারত আটকে নেই।

এই কারণেই কিছু অর্থনীতিবিদ এখন যুক্তি দিচ্ছেন যে RBI-র আরও আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত। রুপিকে কিছুটা দুর্বল হতে দেওয়া মানেই বিপর্যয় নয়। বরং সেটি অর্থনীতির স্বাভাবিক শক-অ্যাবজর্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবু বাস্তবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি খুব কমই পুরোপুরি মুক্ত বাজারে বিশ্বাস করে। কারণ মুদ্রাবাজারের সমস্যা হল, সেখানে মনস্তত্ত্ব অর্থনীতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। একবার যদি “রুপি পড়ছেই” এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্যের চেয়েও ভয় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ফলে RBI-র জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ সম্ভবত মধ্যপন্থা।

অর্থাৎ—

  • রিজার্ভ ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু সীমিতভাবে।
  • বাজারে উপস্থিত থাকতে হবে, কিন্তু যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না।
  • রুপিকে পড়তে দিতে হবে, কিন্তু বিশৃঙ্খলভাবে নয়।

শেষ কথা: রুপির রক্ষাকবচ লুকিয়ে অর্থনীতির নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতায়

এবং তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, সরকারকে বুঝতে হবে যে মুদ্রার স্থিতিশীলতা শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দায়িত্ব নয়। যদি তেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো না যায়, যদি রপ্তানির কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী না হয়, যদি বিদেশি মূলধনের উপর অতিনির্ভরতা বাড়তেই থাকে—তাহলে কোনও রিজার্ভই শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হবে না।

শেষ পর্যন্ত মুদ্রার শক্তি রিজার্ভে নয়, অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতায় নিহিত।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতি দুর্বল মুদ্রাকেও সামলে নিতে পারে। কিন্তু দুর্বল অর্থনীতি শক্তিশালী মুদ্রাকে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারে না। সম্ভবত এটাই আজকের ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

রুপিকে বাঁচানোর চেয়ে বেশি জরুরি হল এমন অর্থনীতি তৈরি করা, যাকে বাঁচানোর জন্য প্রতিদিন রুপিকে রক্ষা করতে না হয়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles