International

জনপ্রিয় আইকো, সিংহাসনে বাধা!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁকে একঝলক দেখার জন্য অসহ্য গরমেও অপেক্ষা করেন বিপুল সংখ্যক মানুষ।
  • রাজকীয় মর্যাদা, সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতে মুগ্ধ তাঁর অনুরাগীরা।
  • অথচ জাপানের ২৪ বছরের রাজকুমারী আইকো যতই জনপ্রিয় হোন, দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী সম্রাটের সিংহাসনে বসার অধিকার তাঁর নেই।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁকে একঝলক দেখার জন্য অসহ্য গরমেও অপেক্ষা করেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। রাজকীয় মর্যাদা, সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতে মুগ্ধ তাঁর অনুরাগীরা। অথচ জাপানের ২৪ বছরের রাজকুমারী আইকো যতই জনপ্রিয় হোন, দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী সম্রাটের সিংহাসনে বসার অধিকার তাঁর নেই।

সম্রাট নারুহিতো ও সম্রাজ্ঞী মাসাকোর একমাত্র সন্তান আইকো। একসময় লাজুক স্কুলছাত্রী ছিলেন তিনি। গত কয়েক বছরে জনসমক্ষে এবং সংবাদমাধ্যমের সামনে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাপানের রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কও নতুন করে জোরালো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, রাজপরিবারে সদস্যসংখ্যা ক্রমশ কমে আসার পরেও কেন নারীদের সিংহাসনে বসার অধিকার দেওয়া হবে না?

প্রায় ১৪০ বছর আগে প্রবর্তিত বিধান অনুযায়ী, জাপানের ‘ক্রিস্যান্থিমাম সিংহাসনে’ কেবল পুরুষেরাই উত্তরাধিকারী হতে পারেন। অথচ জনমতের একটি বড় অংশ এই নিয়ম বদলানোর পক্ষে। তাঁদের মতে, কোনও নারীকে নিজের অধিকারে সম্রাজ্ঞী হওয়ার সুযোগ দিলে উত্তরাধিকার সংকট মোকাবিলাতেও সুবিধা হতে পারে।

জাপানের বৃহত্তর সমাজের মতো রাজপরিবারও জনসংখ্যাগত সংকটের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তিন দশক আগে রাজপরিবারে সদস্যসংখ্যা ছিল ৩০। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬-তে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ সদস্য মাত্র পাঁচজন।

রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও নারীর সিংহাসনে বসার অধিকারের পক্ষে জনসমর্থন যথেষ্ট বেশি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মাইনিচি শিম্বুন-এর এক জনমত সমীক্ষায় ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা কোনও নারীর সম্রাটের আসনে বসার পক্ষে মত দেন। বিপক্ষে ছিলেন মাত্র ১০ শতাংশ।

উত্তরাধিকার সংকটের মুখে রাজপরিবার

জাপানে বর্তমানে চালু আইনটি ১৯৪৭ সালে পাশ হলেও এর শিকড় মেইজি যুগে, ১৮৮৯ সালের আইনে। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো রাজতন্ত্রে পুরুষ উত্তরাধিকারীর সংখ্যা কমে আসায় বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির রক্ষণশীল সরকারকেও।

এই মুহূর্তে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার তালিকায় রয়েছেন মাত্র তিনজন পুরুষ—সম্রাট নারুহিতোর ছোট ভাই যুবরাজ আকিশিনো, তাঁর ছেলে রাজকুমার হিসাহিতো এবং সম্রাটের ৯০ বছরের কাকা রাজকুমার হিতাচি।

২০ বছরের হিসাহিতো বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। চার দশকের মধ্যে তিনিই রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া প্রথম পুত্রসন্তান। তাঁর কোনও পুত্রসন্তান না হলে ভবিষ্যতে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

আগের সরকারগুলি এমন আইন সংশোধনের কথা ভেবেছিল, যার মাধ্যমে রাজপরিবারেও নারী-পুরুষের সমতার সুযোগ তৈরি হতে পারত। কিন্তু রক্ষণশীল সাংসদদের বিরোধিতা এবং ২০০৬ সালে হিসাহিতোর জন্মের পর সেই আলোচনা থমকে যায়।

চলতি বছরের গ্রীষ্মে তাকাইচির দল ও তার রক্ষণশীল সহযোগীরা এমন কিছু সংশোধনী পাশ করায়, যা পুরুষদের মাধ্যমে উত্তরাধিকারের ধারাকে বজায় রাখার পথ প্রশস্ত করেছে। এই পদক্ষেপ নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

চলতি মাসের শেষ দিকে সংশোধনগুলি কার্যকর হওয়ার কথা। নতুন ব্যবস্থায় রাজপরিবারের নারী সদস্যেরা রাজবংশের বাইরের কাউকে বিয়ে করলেও তাঁদের রাজকীয় মর্যাদা বজায় রাখতে পারবেন। পাশাপাশি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজপরিবারের বাইরে চলে যাওয়া ১১টি পার্শ্বশাখার পিতৃসূত্রে যুক্ত পুরুষ বংশধরদের ফের রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার পথও খুলবে।

এই ব্যবস্থায় দূরসম্পর্কের কোনও পুরুষ আত্মীয়কে রাজপরিবারের মূল শাখায় দত্তক নেওয়া সম্ভব হতে পারে, যদি তিনি অবিবাহিত হন এবং তাঁর বয়স ১৫ বছরের বেশি হয়। পরে তাঁর পুত্রসন্তান জন্মালে সেই সন্তানও উত্তরাধিকারের তালিকায় জায়গা পেতে পারে।

জনমতের এক দিকে আইকো, অন্য দিকে আইন

জাপানের রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নারী অধিকার বিষয়ক কমিটি জাপান সরকারকে সিংহাসনে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। টোকিয়ো সেই হস্তক্ষেপকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘অনুপযুক্ত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। সরকারের বক্তব্য ছিল, রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার জাতীয় পরিচয়ের মৌলিক প্রশ্ন।

রাষ্ট্রপুঞ্জের আহ্বান এবং দেশের জনমত—দুইয়ের পরেও নারী সম্রাটের প্রশ্নে অবস্থান বদলায়নি তাকাইচির সরকার। অথচ তাকাইচিই জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী।

উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সংশোধন নিয়ে বিতর্কের সময় আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে তাকাইচি বলেন, ১২৬ প্রজন্ম ধরে পিতৃবংশের ধারায় রাজপরিবারের উত্তরাধিকার বজায় রয়েছে। তাঁর মতে, এই ঐতিহাসিক ধারাই সম্রাটের কর্তৃত্ব ও বৈধতার ভিত্তি।

তাকাইচি আরও জানিয়েছেন, সংশোধনগুলির লক্ষ্য উত্তরাধিকার সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া; নারী সম্রাটের প্রশ্নে বিতর্কের নিষ্পত্তি করা নয়।

তবে টোকিয়োর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া, যিনি রাজপরিবারের বংশধারা ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞ, মনে করেন, সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলি স্পষ্টভাবেই পিতৃবংশের ধারায় উত্তরাধিকার বজায় রাখার দিকে ইঙ্গিত করছে।

তাঁর মতে, শুধু নারী হওয়ার কারণে কাউকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে।

ওকাওয়া বলেন, জাপানের বহু মানুষ আইকোকে বড় হতে দেখেছেন। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁর সংযম, মর্যাদা ও সৌজন্য জনসমর্থন বাড়াতে সাহায্য করেছে। সম্রাট নারুহিতো জনগণের কাছাকাছি থেকে জাতির প্রতীক হিসেবে যে ভূমিকার কথা বলে থাকেন, অনেকের চোখে আইকো সেই ধারণারই প্রতিফলন।

রাজকুমারীর অনুরাগী জিন ইনস্টাগ্রামে আইকোকে নিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন। তাঁর অভিযোগ, পুরুষদের একচেটিয়া উত্তরাধিকারের নিয়ম বদলানোর পক্ষে বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সরকার তা উপেক্ষা করেছে।

জিনের মতে, বাবার উত্তরসূরি হওয়ার জন্য আইকো যথেষ্ট যোগ্য। তিনি বলেন, “তিনি সম্রাটের একমাত্র সরাসরি বংশধর। তাঁর চরিত্র ও মর্যাদাবোধ সর্বোচ্চ মানের। জাপানের প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা যে আইকোর রয়েছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।”

অবশ্য আইকো বা রাজপরিবারের অন্য কোনও নারী সিংহাসনে বসলে জাপানের ইতিহাসে সেটি প্রথম ঘটনা হবে না। অতীতে দেশটিতে আটজন নারী শাসক ছিলেন। তবে তাঁদের শাসনকে মূলত পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্ম না হওয়া পর্যন্ত রাজবংশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ গো-সাকুরামাচি ১৭৬২ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

রাজপরিবারের ইঙ্গিতেও কি বদল আসবে?

জাপানের রাজপরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করার সুযোগ সীমিত। ফলে বর্তমান উত্তরাধিকার ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে সংযত ভাষায়।

জুন মাসে এক সাংবাদিক বৈঠকে সংসদে চলা উত্তরাধিকার বিতর্ক প্রসঙ্গে সম্রাট নারুহিতু বলেন, রাজপরিবারে পর্যাপ্ত সদস্যসংখ্যা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মানুষ সেই আলোচনা বুঝবেন এবং সমর্থন করবেন।

তাঁর ছোট ভাই যুবরাজ আকিশিনো আরও স্পষ্ট করে বলেন, “সমাজের এগিয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি, সমাজের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করাই রাজপরিবারের কর্তব্য। নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না।”

জনমত, উত্তরাধিকার সংকট এবং রাজকুমারী আইকোর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে জাপানের রাজতন্ত্রের সামনে প্রশ্নটি ক্রমশ বড় হচ্ছে। তবে আপাতত আইকোর প্রতি মানুষের বিপুল সমর্থন সত্ত্বেও সিংহাসনের দরজা তাঁর জন্য বন্ধই থাকছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles