International

‘নাজা’র নকল!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • গাজায় প্যালেস্টাইনিদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গার্ডিয়ানের পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্রের বক্তব্য খণ্ডনে পাল্টা ছবির প্রচার ইজরায়েল সরকারের; মূল ছবির ওয়েবসাইট সেজে দর্শকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও গাজায় প্যালেস্টাইনি…
  • আর সেই ছবির প্রচারে নেমেছে ইজরায়েলি দূতাবাসগুলি।
  • অভিযোগ, প্রথমে মূল তথ্যচিত্রের প্রচারমূলক ওয়েবসাইটের ছদ্মবেশ নিয়েছিল পাল্টা ছবির ওয়েবসাইটটি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

গাজায় প্যালেস্টাইনিদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গার্ডিয়ানের পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্রের বক্তব্য খণ্ডনে পাল্টা ছবির প্রচার ইজরায়েল সরকারের; মূল ছবির ওয়েবসাইট সেজে দর্শকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও

গাজায় প্যালেস্টাইনি সাধারণ মানুষের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘নাজা’র বক্তব্য খণ্ডন করতে কার্যত সেই ছবিরই নির্মাণশৈলী নকল করে পাল্টা একটি অনলাইন ছবি তৈরি করা হয়েছে। আর সেই ছবির প্রচারে নেমেছে ইজরায়েলি দূতাবাসগুলি। অভিযোগ, প্রথমে মূল তথ্যচিত্রের প্রচারমূলক ওয়েবসাইটের ছদ্মবেশ নিয়েছিল পাল্টা ছবির ওয়েবসাইটটি। পরে সেটিই হয়ে ওঠে ইজরায়েলের বক্তব্য প্রচারের হাতিয়ার।

অস্কারজয়ী পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র‌্যাচেল সজোরের পরিচালনায়, গার্ডিয়ানের প্রযোজনায় তৈরি ‘নাজা’ এখন প্রেক্ষাগৃহে চলছে। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে ছবিটি দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গাজা যুদ্ধে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত নজরদারি ও নিশানা নির্ধারণের ব্যবস্থাগুলি কী ভাবে কাজ করেছে, তা তুলে ধরেছে তথ্যচিত্রটি। ছবির বক্তব্য, বিপুলসংখ্যক প্যালেস্টাইনি সাধারণ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা জেনেও হামাসের সদস্যদের নিশানা করতে ওই ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই তথ্যচিত্র ঘিরে শুরু থেকেই ক্ষুব্ধ ইজরায়েল সরকার। পরিচালকদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার দাবিও উঠেছে। এর মধ্যেই গত কয়েক দিনে ইজরায়েলি দূতাবাসগুলি ‘নাজা: দ্য রিয়েল স্টোরি’ নামে একটি অনলাইন ছবির লিঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছে।

তেল আভিভের ছাদে পরিচয় গোপন রেখে সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতো মূল তথ্যচিত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করেছে পাল্টা ছবিটি। সেটি রয়েছে ‘nazadocumentary.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটে। ছবিটির নির্মাতা ইজরায়েলি আইনজীবী ও সংরক্ষিত বাহিনীর সেনাসদস্য অ্যারিয়েল অ্যাভারবুখ। তাঁর দাবি, এটি একটি ‘আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ’, যার লক্ষ্য ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হত্যার অভিযোগ থেকে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া। পাল্টা ছবিতে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নীতিনিষ্ঠ সেনাবাহিনী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

ওয়েবসাইটে আর এক নির্মাতা হিসেবে রয় দানিনোর নাম রয়েছে। তিনি দক্ষিণপন্থী ‘ইজরায়েল ফার্স্ট’ দলের প্রার্থী।

ছদ্মবেশে প্রচার, ভিউ নিয়েও প্রশ্ন

ওয়েবসাইটটির ডোমেন নিবন্ধিত হয়েছিল ১৬ সেপ্টেম্বর—ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মূল ‘নাজা’র প্রথম প্রদর্শনীর মাত্র ছয় দিন পরে। উৎসবে ছবিটি বিশেষ জুরি পুরস্কার পায়। প্রদর্শনীর পর দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানোর ঘটনাও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল।

প্রথম দিকে ওয়েবসাইটটি নিজেকে মূল ‘নাজা’ ছবির প্রচারমূলক পাতা হিসেবে তুলে ধরেছিল। পরিচালক হিসেবে সেখানে আব্রাহাম ও সজোরের নাম দেওয়া হয়। কোন কোন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি দেখানো হবে, তার তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছিল।

সাইটে মূল ছবির আনুষ্ঠানিক সংক্ষিপ্তসারের বক্তব্য বিকৃত করে লেখা হয়েছিল, ‘রাতে তেল আভিভের ছাদে শুট করা এই ছবি গাজায় সন্ত্রাসবাদীদের পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে হত্যা করার জন্য ইজরায়েল যে ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করে, তার বিস্তারিত তুলে ধরেছে।’ মূল ছবিতে প্যালেস্টাইনি সাধারণ মানুষের মৃত্যুর যে প্রসঙ্গ রয়েছে, তা কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছিল এই বিবরণে।

পরে ওয়েবসাইটে ‘নাজা: দ্য রিয়েল স্টোরি’র ভিডিও যুক্ত হওয়ার পর সাম্প্রতিক সংশোধনে ওই বিবরণ সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তত দিনে সাইটটি মূল ছবির প্রচারপাতা থেকে ইজরায়েলের পাল্টা প্রচারের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

সাইটের দর্শকসংখ্যার হিসাব নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিটি চার কোটি কুড়ি লক্ষেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। অথচ ছবিটির নিজস্ব ইউটিউব পাতায় ভিউয়ের সংখ্যা মাত্র ৩০ হাজার।

একটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিপুল ব্যবধানের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল, প্রকৃত দর্শকসংখ্যার বদলে ওয়েবসাইটে মানুষ বা স্বয়ংক্রিয় বটের পাঠানো অনুরোধের ভিত্তিতে কাউন্টারটি বাড়ছে। চার কোটি কুড়ি লক্ষ ভিউয়ের দাবির উৎস জানতে চাওয়া হলে অ্যাভারবুখ বলেন, তিনি তা জানেন না। প্রশ্নগুলি তাঁর প্রযুক্তি বিভাগের কাছে পাঠাতে বলেন তিনি।

আমেরিকায় ইজরায়েলের দূতাবাস সমাজমাধ্যমে পাল্টা ছবিটি ভাগ করে নিয়েছে। দূতাবাসের দাবি, ছবিটি তৈরির সঙ্গে বিদেশ মন্ত্রক যুক্ত ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু ‘নির্মাতাদের বক্তব্য আরও ছড়িয়ে দেওয়া’ এবং রক্তপাত নিয়ে ‘বিদ্বেষমূলক অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ’ খণ্ডনের যুক্তিগুলি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

বৃহস্পতিবার ইজরায়েল সরকার জানিয়েছে, ‘ইজরায়েলের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে অবদানের জন্য’ পাল্টা ছবির নির্মাতাদের প্রশংসাপত্র দেওয়া হচ্ছে। সরকারের দাবি, ছবিটি কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে।

‘মনোযোগ সরানোর নির্লজ্জ চেষ্টা’

গার্ডিয়ানের এক মুখপাত্রের বক্তব্য, ইজরায়েল সরকার এমন একটি ওয়েবসাইটে রাখা ছবির প্রচার করছে, যে সাইটটি প্রথমে মিথ্যা ভাবে দাবি করেছিল, সেটি আব্রাহাম ও সজোরের তথ্যচিত্রের প্রচারপাতা।

মুখপাত্র বলেন, ‘দর্শকদের বিভ্রান্ত করা এবং “নাজা” যে জরুরি প্রশ্নগুলি তুলেছে, সেগুলি থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার এটি এক নির্লজ্জ চেষ্টা।’

মূল ‘নাজা’ তথ্যচিত্রে ইজরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার ভিতরের ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিচালিত গণনজরদারি কী ভাবে সক্রিয় করা হয়েছিল, তা উঠে এসেছে তাঁদের বক্তব্যে। যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত সামরিক ব্যবস্থাগুলি সম্পর্কে জানেন, এমন একশোরও বেশি সূত্রের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ছবিটি তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলি সেনাবাহিনীও তথ্যচিত্রটির জবাবে দশ পাতার একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি কমিশন ইজরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলে বর্ণনা করেছে।

তথ্যচিত্র ঘিরে হুমকি, তদন্ত

‘নাজা’র প্রথম প্রদর্শনীর এক সপ্তাহের মধ্যেই ইজরায়েলের সংস্কৃতি মন্ত্রক ছবিটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা করে। আব্রাহাম ও সজোরের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার দাবিও তোলে মন্ত্রক। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আইয়াল জামির জানিয়েছেন, ছবিটির বিরুদ্ধে তাঁরা ‘হাতে থাকা প্রতিটি উপায়’ ব্যবহার করবেন।

ছবির পরিচালকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছেছে। সজোরের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ইজরায়েলের আশদোদ শহরে একটি দেওয়ালচিত্রে বন্দুকের নিশানার মধ্যে দুই পরিচালককে দেখানো হয়।

সোমবার অতি দক্ষিণপন্থী কর্মী মর্দেখাই ডেভিড ঘোষণা করেন, আব্রাহামকে ‘তাড়া’ করার জন্য একটি দল গড়তে তিনি তহবিল সংগ্রহ করছেন। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ওকে খুঁজে বার করব।’

আব্রাহাম ও সজোরের আগের ছবি ‘নো আদার ল্যান্ড’ নিয়েও একই ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালে অস্কারজয়ী ওই ছবিতে প্যালেস্টাইনি গ্রাম মাসাফের ইয়াত্তার ধ্বংসের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। ছবিটির দুই প্যালেস্টাইনি সহপরিচালক বাসেল আদ্রা ও হামদান বাল্লাল অস্কার পাওয়ার পর থেকে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে হয়রানি বা আটক হওয়ার শিকার হয়েছেন।

আব্রাহাম ও সজোর নিউ ইয়র্কে ‘নাজা’র প্রথম প্রদর্শনীর পর প্রশ্নোত্তর পর্বে ছবিটি ঘিরে প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন। সজোরের বক্তব্য, ‘এই ব্যবস্থাগুলি আড়াল করতে আমাদের দেশ এত কিছু করছে। এই জগৎ এমনকি ইজরায়েলের সাধারণ মানুষের সামনেও উন্মুক্ত নয়।’

বৃহস্পতিবার লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির অন্যতম প্রযোজক জেমস উইলসন বলেন, ইজরায়েলি রাজনীতিকদের কাছ থেকে এমন ‘উন্মত্ত, গালিগালাজে ভরা, আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া’ আসবে, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি। অসন্তোষের আশঙ্কা থাকলেও হুমকি এবং জনতাকে উসকে দেওয়ার ঘটনা যে এই মাত্রায় পৌঁছবে, তা তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

উইলসনের কথায়, নিজের দেশের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক মহলের কাছ থেকে দেশদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি পাওয়া দুই পরিচালকের জন্য অত্যন্ত কঠিন, চাপের এবং আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।

তবে এই বিতর্কের মধ্যেও আন্তর্জাতিক দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখতে চান প্রযোজক। তাঁর কথায়, ‘বিশ্বের অধিকাংশ জায়গায় ছবিটি যে বিপুল ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে, আমি সেই দিকটিই দেখার চেষ্টা করি।’

প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পাশাপাশি নভেম্বরের শেষ দিক থেকে গার্ডিয়ানের ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে দেখা যাবে ‘নাজা’।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles