কচ্ছপের রাজত্ব!

যা জানা জরুরি
- সেশেলসের আলডাব্রা প্রবালদ্বীপে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার দৈত্যাকার কচ্ছপ, ঊনবিংশ শতকে সংখ্যা নেমেছিল হাজারেরও নীচে; কয়েক দশকের সংরক্ষণে বিরাট সাফল্য, তবে জলবায়ু পরিবর্তনে…
- কয়েক শতক পরে সেই দৈত্যাকার কচ্ছপেরাই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটি গোটা প্রবালদ্বীপ।
- ভারত মহাসাগরের সেশেলসের আলডাব্রা অ্যাটলে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার দৈত্যাকার কচ্ছপের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সেশেলসের আলডাব্রা প্রবালদ্বীপে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার দৈত্যাকার কচ্ছপ, ঊনবিংশ শতকে সংখ্যা নেমেছিল হাজারেরও নীচে; কয়েক দশকের সংরক্ষণে বিরাট সাফল্য, তবে জলবায়ু পরিবর্তনে নতুন আশঙ্কা
এক সময়ে নির্বিচারে শিকারের জেরে সংখ্যা নেমে এসেছিল হাজারেরও নীচে। কয়েক শতক পরে সেই দৈত্যাকার কচ্ছপেরাই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটি গোটা প্রবালদ্বীপ। ভারত মহাসাগরের সেশেলসের আলডাব্রা অ্যাটলে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার দৈত্যাকার কচ্ছপের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। সংখ্যাটি শুধু এই প্রজাতির ক্ষেত্রে নথিভুক্ত সর্বোচ্চ হিসাবগুলির অন্যতম নয়, সেশেলসের মোট মানবজনসংখ্যাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। কয়েক দশকের সংরক্ষণ ও সংখ্যা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা যে কতটা সফল হতে পারে, এই হিসাব তারই নজির।
সেশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশন (এসআইএফ) এবং এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভলিউশন’ বিজ্ঞানপত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের কচ্ছপ গণনার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পূর্ণবয়স্ক এবং পূর্ণবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি পর্যায়ে থাকা কচ্ছপ মিলিয়ে গবেষকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুমান, সংখ্যাটি প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার। সমীক্ষার সময়কালে তাদের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল ছিল বলেও জানিয়েছেন গবেষকেরা।
এর আগে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে আলডাব্রায় প্রায় ১ লক্ষ কচ্ছপ রয়েছে বলে যে হিসাব করা হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে সেটিই বহুল ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। নতুন সমীক্ষা সেই পুরনো হিসাবকে অনেকটাই বদলে দিল।
হাজার থেকে লক্ষাধিক
সেশেলসের আলডাব্রা অ্যাটল একটি বলয়াকার প্রবালদ্বীপ। সেখানেই বাস আলডাব্রা প্রজাতির দৈত্যাকার কচ্ছপের। বিশ্বের মাত্র দু’টি জায়গায় বুনো পরিবেশে দৈত্যাকার কচ্ছপের এমন জনগোষ্ঠী রয়েছে—আলডাব্রা এবং গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। তবে গ্যালাপাগোসে এই কচ্ছপের সংখ্যা তুলনায় অনেক কম।
ঊনবিংশ শতকে নির্বিচারে শিকার ও ব্যবহারের কারণে আলডাব্রার কচ্ছপের সংখ্যা এক হাজারেরও নীচে নেমে গিয়েছিল। তাদের মাংস ও অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা হত। সেই বিপর্যয় থেকে প্রজাতিটিকে ফিরিয়ে আনতে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কর্মসূচি।
১৯৮১ সালে আলডাব্রাকে কঠোর সুরক্ষাবিধির আওতায় প্রাকৃতিক সংরক্ষণক্ষেত্র ঘোষণা করা হয়। পরের বছর, ১৯৮২ সালে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যস্থলের স্বীকৃতি পায় প্রবালদ্বীপটি। ধারাবাহিক সংরক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টার ফলেই আজ এই বিপুল সংখ্যক কচ্ছপ সেখানে টিকে রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এসআইএফের প্রধান নির্বাহী ডক্টর ফ্রাউকে ফ্লাইশার-ডোগলি বলেন, “আমাদের প্রবালদ্বীপে ১ লক্ষ ৮০ হাজারেরও বেশি দৈত্যাকার কচ্ছপ অবাধে বিচরণ করছে। সংরক্ষণের কাজে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার কতটা সাফল্য এনে দিতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। সেশেলসের জন্য, বিশ্বের জন্য এবং আলডাব্রাকে রক্ষা করতে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের জন্য এটি অসাধারণ সুখবর।”
গবেষকেরা এই সাফল্যকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
গাছপালার আড়ালে কত কচ্ছপ?
তবে এত বিপুল সংখ্যক কচ্ছপের সঠিক হিসাব পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। আলডাব্রার ঘন গাছপালা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে দ্বীপের সব অংশে কচ্ছপকে খুঁজে বের করে গোনা কঠিন। তাই গবেষকেরা সরাসরি দেখা কচ্ছপের সংখ্যার পাশাপাশি, চোখে না পড়া কচ্ছপের সংখ্যাও পরিসংখ্যানগত মডেলের সাহায্যে অনুমান করেছেন।
গবেষণার অন্যতম সহলেখক ডক্টর ন্যান্সি বানবেরি বলেন, “আলডাব্রার দৈত্যাকার কচ্ছপ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি এই অঞ্চলে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা কর্মসূচিগুলির অন্যতম। তবে প্রবালদ্বীপের ঘন গাছপালার কারণে কিছু জায়গায় কচ্ছপ গোনা সত্যিই কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যে কচ্ছপগুলি দেখেছি, তার পাশাপাশি যেগুলি আমাদের চোখে পড়েনি, মডেলের সাহায্যে সেগুলির সংখ্যাও হিসাব করেছি। এর ফলে সেশেলসের এই প্রতীক হয়ে ওঠা প্রজাতিটির সংখ্যা সম্পর্কে এ যাবৎ সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আগামী কয়েক দশক ধরে তাদের সংখ্যার পরিবর্তন বুঝতে এই হিসাবকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারব।”
অর্থাৎ, এই সমীক্ষা শুধু কচ্ছপের বর্তমান সংখ্যা জানাচ্ছে না। ভবিষ্যতে তাদের সংখ্যা বাড়ছে, কমছে, নাকি স্থিতিশীল থাকছে—তা বোঝার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করছে।
সাফল্যের মাঝেও জলবায়ুর হুঁশিয়ারি
কচ্ছপের সংখ্যা বিপুল হলেও আলডাব্রার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই সংরক্ষণ পরিকল্পনার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রবালদ্বীপে খরা আরও ঘন ঘন হতে পারে এবং তার স্থায়িত্বও বাড়তে পারে। তাতে কচ্ছপের খাবার ও ছায়াযুক্ত আশ্রয়ের জোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে থাকলে প্রবালদ্বীপের নিচু অংশগুলি বিপদের মুখে পড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে কচ্ছপের আবাসস্থল এবং দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার উপরেও।
তাই বিপুল সংখ্যার এই সাফল্যকে চূড়ান্ত জয় বলে দেখতে নারাজ গবেষকেরা। বরং তাঁদের কাছে এটি আগামী দিনের সংরক্ষণকাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এক সময়ে বিলুপ্তির মুখে চলে যাওয়া প্রাণীদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বদলে যাওয়া পরিবেশে তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে লাগবে আরও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও সংরক্ষণ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



