হান্স বেথে। ফেলিক্স ব্লখ। নিলস বোর। আলবার্ট আইনস্টাইন। এনরিকো ফের্মি। জেমস ফ্রাঙ্ক। অটো ফ্রিশ। স্যামুয়েল গাউডস্মিট। লিলি হর্নিগ। রল্ফ ল্যান্ডশফ। মারিয়া গ্যোপার্ট মেয়ার। রুডলফ পিয়ের্লস। জর্জ প্লাচেক। ইউজিন রাবিনোভিচ। জোসেফ রটব্লাট। লিও সিলার্ড। এডওয়ার্ড টেলার। স্তানিস্লাভ উলাম। জন ভন নিউম্যান। ভিক্টর ভাইসকপফ। ইউজিন উইগনার। ইউরোপ ছেড়ে চলে যাওয়া বিজ্ঞানীদের মধ্যে এঁরা কয়েক জন। তাঁদের অনেকেই পরে ম্যানহাটন প্রকল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মার্কিন উদ্যোগই ছিল এই ম্যানহাটন প্রকল্প।

ইউরোপজুড়ে নাৎসি জার্মানি যে ভয়াবহ অত্যাচার চালাচ্ছিল, এই বিজ্ঞানীদের অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁদের অনেকে ছিলেন ইহুদি; নিজেরাই নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিলেন। অ্যাডলফ হিটলার এবং তাঁর বাহিনীর প্রতি ঘৃণা থেকেই তাঁরা পরমাণু বোমার গবেষণায় বিশেষ তাগিদ অনুভব করেছিলেন। অনেকের কাছেই এই কাজের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ।

ম্যানহাটন প্রকল্পের প্রথম পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ হয় ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। জুলাই–আগস্টে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় দু’টি বোমা। বিজ্ঞানীদের তাড়াহুড়োর একটি কারণ ছিল এই আশঙ্কা—নাৎসি জার্মানিও কি পরমাণু বোমা তৈরি করছে? বিশেষ করে, পদার্থবিদ ও নোবেলজয়ী ভের্নার হাইজেনবার্গের নেতৃত্বে চলা গবেষণা তাঁদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।

সেই উদ্বেগ একেবারে অমূলক ছিল না। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে, মিত্রশক্তির কাছে জার্মানির আত্মসমর্পণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, হাইজেনবার্গের দল দক্ষিণ জার্মানির হাইগারলখ শহরে একটি গির্জার নীচের ভূগর্ভস্থ ঘরে পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করেছিল।

‘বি৮ পাইল’ নামে পরিচিত ওই ব্যবস্থায় প্রায় ১,৪০০ লিটার ভারী জলের মধ্যে শিকলে ঝোলানো ছিল ইউরেনিয়ামের ৬৬৪টি ঘনক। চুল্লির কেন্দ্রভাগ ঘিরে ছিল ৪০ সেন্টিমিটার পুরু গ্রাফাইটের আবরণ। তার বাইরে ছিল অ্যালুমিনিয়ামের একটি স্তর এবং সাধারণ জলের ৬০ সেন্টিমিটার পুরু আর একটি স্তর। বি৮ তৈরি করতে হাইজেনবার্গের দলের ছয় বছর লেগেছিল। কিন্তু সাফল্য বলতে তেমন কিছুই মেলেনি। চুল্লির মধ্যে কয়েকটি নিউট্রন পাঠানো হলে ইউরেনিয়ামের বিক্রিয়ায় আরও নিউট্রন তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়নি।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে হাইজেনবার্গ দাবি করেছিলেন, তাঁরা সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে ‘নেচার’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, হাইগারলখে পর্যাপ্ত উপকরণ ছিল না। ইউরেনিয়ামের পরিমাণ আর সামান্য বাড়াতে পারলেই কাজ হয়ে যেত।

কিন্তু মার্কিন গবেষকদের একটি নতুন সমীক্ষা বলছে, হাইজেনবার্গ ও তাঁর সহকর্মীরা আসলে লক্ষ্য থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘পিএনএএস নেক্সাস’ পত্রিকায়।

হাইজেনবার্গের গবেষণার জন্য তৈরি আনুমানিক ১,১০০টি ইউরেনিয়াম ঘনকের মধ্যে এখন মাত্র ১৪টির মতো টিকে আছে। পাইকনোমিটার নামে একটি যন্ত্র ব্যবহার করে গবেষকেরা একটি ঘনকের ঘনত্ব মেপে দেখেছেন, তা প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ১৮.৫৩৫ গ্রাম। নিরেট ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ১৯.০১ গ্রাম। ঘনত্বের এই তফাত থেকে বোঝা যায়, ঘনকটির মধ্যে সূক্ষ্ম ফাঁকফোকর ছিল। আর একটি ঘনকে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ পাওয়া গিয়েছে ভরের হিসাবে ০.৭২৪ শতাংশ। অর্থাৎ, সেটি ছিল প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নয়।

১৯৪৪ সালের মার্চে কার্ল ভির্টৎস নামে এক জার্মান পদার্থবিদ জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাবশত সাধারণ জল মিশে যাওয়ায় নাৎসি জার্মানির মজুত ভারী জলের বিশুদ্ধতা নেমে এসেছে ৯৮.৮৫ শতাংশে। যুদ্ধের পরে, ১৯৪৭ সালে হাইগারলখ থেকে পাওয়া একটি নমুনায় বিশুদ্ধতা ছিল মাত্র ৯৬.৮ শতাংশ। বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম সংস্থা নর্স্ক হাইড্রোর নথি বিশ্লেষণ করেও গবেষকেরা হিসাব করেছেন, যুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি সর্বাধিক ১,৮৩৬ কিলোগ্রাম বিশুদ্ধ ভারী জল পেয়েছিল।

এই তথ্য এবং বি৮ পাইলের নকশা মিলিয়ে হিসাব করে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, চুল্লিটির নিউট্রন গুণন গুণক ছিল ০.৯৪২। কোনও চুল্লিকে ‘ক্রিটিক্যাল’ হতে হলে, অর্থাৎ নিজের শক্তিতে শৃঙ্খল বিক্রিয়া চালিয়ে যেতে হলে, এই গুণক ১ হতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও ০.০৫৮-এর ঘাটতি আসলে যথেষ্ট বড়।

গবেষকেরা দেখেছেন, বি৮-এ ইউরেনিয়ামের ঘনকগুলি পরস্পরের খুব কাছাকাছি সাজানো ছিল। ফলে ভারী জল কার্যকরভাবে নিউট্রনের গতি কমাতে পারছিল না। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ভারী জলের বিশুদ্ধতা বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করলেও গুণকটি বেড়ে মাত্র ০.৯৫ হত।

ইউরেনিয়াম ও ভারী জলের পরিমাণের ১,২০০টিরও বেশি সম্ভাব্য সমন্বয় নিয়ে তাঁরা কম্পিউটারে অনুকরণমূলক পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাতে দেখা গিয়েছে, বি৮ পাইলকে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পৌঁছতে হলে অন্তত ২,৯৯৪ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম এবং ৩,৪১১ লিটার ভারী জল প্রয়োজন হত। অথচ চুল্লিটি খুলে ফেলার সময় সেখানে ছিল ১,৫৩৮ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম এবং ১,৫৪৯ কিলোগ্রাম ভারী জল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, তৎকালীন জার্মানির সব গবেষণাকেন্দ্র মিলিয়েও ছিল মাত্র ২,৫৭২ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম এবং ৯৬.৮ শতাংশ বিশুদ্ধতার ১,৮৯০ কিলোগ্রাম ভারী জল। প্রয়োজনের তুলনায় এই ঘাটতি ছিল যথেষ্ট বড়। সমস্ত উপকরণ একত্র করলেও নিউট্রন গুণন গুণক সর্বোচ্চ ০.৯৫৯ পর্যন্ত পৌঁছতে পারত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পারমাণবিক চুল্লি, ‘শিকাগো পাইল-১’, ১৯৪২ সালের ২ ডিসেম্বর প্রথম ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পৌঁছয়। সেখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম। আর নিউট্রনের গতি কমানোর উপাদান বা মডারেটর হিসেবে ভারী জলের বদলে ব্যবহৃত হয়েছিল গ্রাফাইট। এই কারণেই পারমাণবিক গবেষণার ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেছেন, হাইজেনবার্গ ও তাঁর সহকর্মীরা আসলে ভুল মডারেটর বেছে নিয়েছিলেন।

তবে ২০২৫ সালে ‘দ্য ইউরোপিয়ান ফিজিক্যাল জার্নাল এইচ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হয়নি। তার বক্তব্য, আমেরিকা অত্যন্ত কম বোরনযুক্ত পেট্রোলিয়াম কোক সংগ্রহ করতে পেরেছিল এবং তা থেকে চুল্লিতে ব্যবহারের উপযোগী গ্রাফাইট তৈরি করেছিল। কিন্তু জার্মানিতে ধাতুবিদ্যার কাজে ব্যবহৃত কোক থেকে তৈরি গ্রাফাইটে বোরনের পরিমাণ ছিল বেশি। বোরন নিউট্রন শোষণ করে নেয়।

বি৮ পাইলে ব্যবহার করা হয়েছিল তার আগের বি৭ পাইলের গ্রাফাইট। নতুন গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে, তাতে বোরন-সমতুল্য দূষণের পরিমাণ ছিল ভরের হিসাবে প্রতি দশ লক্ষ অংশে ৩.৪ অংশ, যাকে সংক্ষেপে ৩.৪ ডব্লিউপিপিএম বলা হয়। আরও আগে ব্যবহৃত সিমেন্সের গ্রাফাইটে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.৬ ডব্লিউপিপিএম। অন্যদিকে, ম্যানহাটন প্রকল্পে ব্যবহৃত গ্রাফাইটে বোরনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৪ ডব্লিউপিপিএম।

কম্পিউটারের অনুকরণমূলক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বি৭ কিংবা তারও আগের চুল্লিগুলিতে ইউরেনিয়ামের ঘনকগুলি পরস্পরের থেকে যত দূরেই রাখা হোক না কেন, তাতে ফল বদলাত না। গ্রাফাইটের দূষণই চুল্লিগুলির ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পৌঁছনো অসম্ভব করে তুলেছিল।

তা হলে নাৎসি জার্মানির পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ম্যানহাটন প্রকল্পের মধ্যে বড় পার্থক্যটি সম্ভবত ছিল শিল্পক্ষেত্রের সামর্থ্যে। আমেরিকা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার একাধিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিল এবং সেগুলি কাজে লাগানোর পরিকাঠামো গড়ে তুলেছিল। পাশাপাশি তৈরি করেছিল পারমাণবিক চুল্লি, রাসায়নিক পৃথকীকরণ কেন্দ্র এবং অস্ত্র গবেষণাগার। প্রকল্পটি সর্বোচ্চ বিস্তৃতির সময় সব মিলিয়ে ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছিল। বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২২০ কোটি ডলার। নাৎসি জার্মানির হাতে এই মাপের কোনও উদ্যোগই ছিল না।

২০১৫ সালে ‘আনগেভান্টে কেমি’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, নাৎসিদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কিছু ইউরেনিয়াম উল্লেখযোগ্য নিউট্রন প্রবাহের সংস্পর্শে আসেনি। সম্ভবত সেই ইউরেনিয়াম এসেছিল বর্তমান চেকিয়ার ইয়োয়াখিমস্টাল থেকে। সীমিত অর্থে এই তথ্য শিল্পপর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কর্মসূচি না থাকার ইঙ্গিত দেয়।

নাৎসিদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বহু ক্ষেত্রে একই তথ্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, জার্মান বিজ্ঞানীরা কি ইচ্ছাকৃতভাবে বোমা তৈরির প্রকল্পে দেরি করিয়েছিলেন? কিছু প্রযুক্তিগত প্রশ্নও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। যেমন, হাইগারলখের চুল্লিতে ব্যবহৃত ভারী জলের প্রকৃত বিশুদ্ধতা কত ছিল, তা জানা নেই। গ্রাফাইটে বোরনের পরিমাণের হিসাবও সরাসরি পরীক্ষা থেকে পাওয়া নয়; পুরনো নথির ভিত্তিতে নির্ধারিত।

সব মিলিয়ে আজ যে ছবিটি সামনে আসছে, তা থেকে জার্মান পদার্থবিদদের অযোগ্য বলা যায় না। আবার তাঁরা পরমাণু বোমা তৈরির একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, এমনও নয়। একটি পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য যত উপকরণ দরকার ছিল, তাঁদের হাতে তা ছিল না। উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থাও যথেষ্ট উন্নত ছিল না। তা সত্ত্বেও, সেই সময় যতটুকু তথ্য জানা ছিল এবং বিশ্বের সেরা পারমাণবিক পদার্থবিদদের অনেকেই যে জার্মানিতে ছিলেন, সে কথা মাথায় রাখলে ম্যানহাটন প্রকল্পের বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ বোঝা যায়।