মোদী, শাহ, ভাগবত ও জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহের’ জন্য ব্যবস্থা হবে: হুঁশিয়ারি রাহুলের

যা জানা জরুরি
- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি…
- মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে বিরোধী সাংসদদের মিছিল পুলিশ আটকে দেওয়ার পরে তিনি এই মন্তব্য করেন।
- তাঁর অভিযোগ, ভোট চুরির মাধ্যমে দেশকে কবজা করেছেন শাসকপক্ষের নেতারা এবং তাঁদের সাহায্য করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে বিরোধী সাংসদদের মিছিল পুলিশ আটকে দেওয়ার পরে তিনি এই মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, ভোট চুরির মাধ্যমে দেশকে কবজা করেছেন শাসকপক্ষের নেতারা এবং তাঁদের সাহায্য করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
আকাশবাণী ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাহুল বলেন, গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতেই তাঁরা পথে নেমেছেন। বিজেপি তাঁর সম্পর্কে কী বলছে, তা নিয়ে তিনি আগ্রহী নন। তাঁর দাবি, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে প্রায় ৩০০ সাংসদ একই উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এগোতে দেওয়া হয়নি। মোদী, শাহ, ভাগবত ও জ্ঞানেশকে দায়বদ্ধতার মুখোমুখি হতেই হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাহুলের বক্তব্য, দেশের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা ‘দেশদ্রোহ’; কেউ দায় এড়াতে পারবেন না। তবে এই শব্দটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগের অংশ। এ দিনের বক্তব্যে তিনি কোনও নির্দিষ্ট মামলার রায় বা দোষসিদ্ধির কথা জানাননি। কাদের বিরুদ্ধে কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেননি।
নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি ঘিরেও সরব হন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী সাংসদেরা কোটি কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের প্রশ্ন শোনার দায়িত্ব কমিশনের রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই যদি কমিশনের কাছে যেতে না দেওয়া হয়, তা হলে গণতন্ত্রের অর্থ কী—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। জ্ঞানেশ কুমার সাংসদদের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন কংগ্রেস নেতা। নিজের বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষের প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ইন্ডিয়া জোটের মিছিল সংসদ এলাকা থেকে নির্বাচন সদনের দিকে এগোচ্ছিল। পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও আশপাশের রাস্তায় ব্যারিকেড বসিয়েছিল পুলিশ। নিরাপত্তাবাহিনীর বাধার মুখে সাংসদেরা রাস্তায় বসে বিক্ষোভ দেখান। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন-সহ একাধিক বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়। আটক সাংসদদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে বাস রাখা হয়েছিল।
এর মধ্যেই ঘটনাপ্রবাহ অন্য দিকে মোড় নেয়। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আকাশবাণী ভবনের ভিতরে ঢুকে পড়েন। কংগ্রেস সূত্রের দাবি, ওই চত্বরের পিছনের দরজা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছিলেন রাহুল। পুলিশ সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁরা ভিতরেই অবস্থানে বসেন। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতাও জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ ছিল না। ভবনের বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
অবস্থান দীর্ঘায়িত হলেও সরে যেতে রাজি হননি রাহুলরা। রাহুল জানান, যতক্ষণ প্রয়োজন তাঁরা বসে থাকবেন। বিক্ষোভের জায়গা নিয়ে প্রশাসনের আপত্তি থাকলে কোথায় বসা যাবে, তা জানাতে বলেন তিনি। পরে ডেরেক ও’ব্রায়েন ও মহুয়া মৈত্রও আকাশবাণী ভবনে পৌঁছন। সন্ধ্যায় প্রায় ন’ঘণ্টার অবস্থানের শেষে পুলিশ রাহুল, প্রিয়াঙ্কা এবং অন্য বিরোধী নেতাদের আটক করে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
সাক্ষাতের দাবি নিয়ে অবশ্য নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য আলাদা। মঙ্গলবার কোনও রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়া যায়নি। ফলে বিরোধীরা যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কথা শুনতে অস্বীকার করার অভিযোগ তুলছে, কমিশন সেখানে বৈঠক চাওয়ার পদ্ধতির প্রশ্ন সামনে এনেছে। সাক্ষাতের উদ্যোগ হয়েছিল কি না, সেই বিষয়েও দু’পক্ষের বক্তব্যের ফারাক প্রকাশ্যে এসেছে।
এই বিক্ষোভের পটভূমিতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে চলতি বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, তালিকা সংশোধনের আড়ালে যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং তার রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য নিয়ে সাম্প্রতিক সংবাদপ্রতিবেদনও আন্দোলনকে জোর দিয়েছে। কমিশন ও বিজেপি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত কয়েক দিনে রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন এবং নাগরিক গোষ্ঠীর ধারাবাহিক প্রতিবাদে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম সংঘাত হয়ে উঠেছে।
দশ মাসে অন্তত ১৪ বার দুই নির্বাচন কমিশনার তাঁদের অজ্ঞাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। কমিশন ওই নোটগুলির অস্তিত্ব স্বীকার করলেও সেগুলিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে ব্যাখ্যা করেছে। সংশ্লিষ্ট উদ্বেগগুলির নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেনি। এই তথ্য সামনে আসার পর কমিশনের অভ্যন্তরে যৌথ সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে।
বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করেছে, নির্বাচনী পরাজয়ের দায় এড়াতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রমণ করছে কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, প্রতিদিন বিক্ষোভের রাজনীতি করার বদলে মানুষের আস্থা অর্জনের দিকে নজর দেওয়া উচিত রাহুলের। মানুষের সেবা করে সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও বিজেপি কর্মীদের কাছ থেকে শেখার পরামর্শও দেন তিনি।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান প্রশ্ন তোলেন, যে নির্বাচনব্যবস্থায় বিরোধীরা বিভিন্ন রাজ্যে জয়ী হয়েছে, সেই ব্যবস্থাকেই এখন অবিশ্বাস করা হচ্ছে কেন। বিজেপি নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে কমিশন চলছে বলে বিরোধীদের অভিযোগকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দেন। দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের অভিযোগ, রাহুলকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় কংগ্রেস অরাজকতা তৈরি করতে চাইছে।
এ দিনের সংঘাতের কেন্দ্রে তাই দুটি পরস্পরবিরোধী দাবি স্পষ্ট। বিরোধীরা ভোটাধিকার এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জবাব চাইছে; বিজেপি বলছে, জনরায় মেনে নিতে না পেরে প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। সেই টানাপড়েনের মধ্যে রাহুলের ‘দেশদ্রোহ’ মন্তব্য আক্রমণের মাত্রা আরও বাড়াল। এখন নজর থাকবে পরবর্তী কর্মসূচিতে। তবে রাজনৈতিক হুঁশিয়ারির পরে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, কমিশনের ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী পদক্ষেপই এই বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



