অভিযোগকারী সাংবাদিকসহ ১৭ আটক, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ

যা জানা জরুরি
- পুলিশের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছিলেন এক মহিলা সাংবাদিক।
- সেই অভিযোগে এফআইআর দায়েরের দাবিতে অবস্থান চলাকালীন সোমবার সকালে তাঁকেই ফের আটক করল দিল্লি পুলিশ।
- প্রাথমিক সংবাদ অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আরও ১৬ জনকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে থেকে সরিয়ে দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পুলিশের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছিলেন এক মহিলা সাংবাদিক। সেই অভিযোগে এফআইআর দায়েরের দাবিতে অবস্থান চলাকালীন সোমবার সকালে তাঁকেই ফের আটক করল দিল্লি পুলিশ। প্রাথমিক সংবাদ অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আরও ১৬ জনকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে থেকে সরিয়ে দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আটক ব্যক্তিদের মারধরের অভিযোগও ওঠে। অভিযোগকারী সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানো আইনজীবীদের বক্তব্য, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাওয়ায় অভিযোগকারিণী ও তাঁর সমর্থকেরাই পুলিশি পদক্ষেপের মুখে পড়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার, ৩ অক্টোবর। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তর সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করছিলেন ওই সাংবাদিক। তাঁর অভিযোগ, ছাত্র সংগঠন আইসার সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করার দৃশ্য রেকর্ড করার সময় এসিপি বিবেক ভগৎ তাঁকে অশালীনভাবে স্পর্শ করেন এবং ধাক্কা দেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। অভিযোগটির সত্যতা এখনও তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সাংবাদিকের দাবি, নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যেই তাঁকে এই আচরণের শিকার হতে হয়েছে।
নিউজলন্ড্রিকে অভিযোগকারিণী ও তাঁর সঙ্গে থাকা আর এক সাংবাদিক জানান, শনিবার সন্ধ্যায় তাঁরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় অভিযোগ জানাতে যান। অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও এফআইআর দায়ের হয়নি। চিকিৎসা পরীক্ষার ব্যবস্থা নিয়েও প্রথমে তাঁদের প্রশ্ন তুলতে হয় বলে দাবি। এরপর সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সমর্থকেরা থানার বাইরে অবস্থান শুরু করেন। তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগ অন্য দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার আশ্বাস যথেষ্ট নয়; অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা নথিভুক্ত করতে হবে।
সোমবারের আটকদের মধ্যে স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবার এবং প্রতিবাদে যোগ দেওয়া ব্যক্তিরা ছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের একে একে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগকারিণী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁরা থানার ভিতরে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগের অগ্রগতি জানতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, প্রতিবাদকারীদের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার আবেদনও জানিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, সেই দাবির জবাব পাওয়ার পরিবর্তে আবার আটকের মুখে পড়তে হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির আইনবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী রত্না সিংহ সমাজমাধ্যমে দাবি করেন, অভিযোগকারী সাংবাদিক তাঁকে জানিয়েছেন যে আটকদের পুলিশ মারধর করেছে। তাঁর আরও অভিযোগ, আটক দু’জনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। রত্নার বক্তব্য, নিজেদের সহকর্মীকে রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ অভিযোগকারী এবং বিচারপ্রার্থীদের বিরুদ্ধেই বলপ্রয়োগ করছে। তিনি অবিলম্বে সকলের মুক্তি দাবি করেন। এই বক্তব্য আইনজীবীর অভিযোগ; মারধরের বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই হয়েছে, এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে নেই।
আটকের পক্ষে দিল্লি পুলিশের যুক্তি, নয়াদিল্লি জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীনে জমায়েতে বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। এক পদস্থ আধিকারিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, পার্লামেন্ট স্ট্রিট বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থান নয়, তাই সেখানে সমাবেশের অনুমতি ছিল না। পুলিশ আরও জানিয়েছে, শনিবার বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে বলা হলেও তাঁরা তা মানেননি। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি মহিলা সাংবাদিকদের অভিযোগগুলির পৃথক অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে দাবি জানাচ্ছেন তাঁদের সমর্থকেরা।
রবিবার দিল্লি পুলিশ স্বীকার করে, তিন মহিলা সাংবাদিকের কাছ থেকে যৌন হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এসেছে। নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের জন্য অভিযোগগুলি কমলা মার্কেটের ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়। পুলিশের বক্তব্য, অভিযোগকারিণীদের বয়ান নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের চিকিৎসা পরীক্ষাও হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হবে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু সোমবার সকালের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওই অভিযোগগুলিতে তখনও এফআইআর নথিভুক্ত হয়নি। এই ব্যবধানই অবস্থানকারীদের ক্ষোভের প্রধান কারণ।
বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে এক পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্য। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীরা বিক্ষোভের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যে নেওয়া পদক্ষেপের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তাঁরা কাজে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। অন্য এক আধিকারিক সংবাদপত্রটিকে দাবি করেন, অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণ নেই। অভিযোগকারী পক্ষ অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাঁদের অবস্থান, বাহিনীর দায়িত্ব পালনের যুক্তি দেখিয়ে যৌন হেনস্থার অভিযোগে মামলা নথিভুক্ত করার দাবি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের তরফে মহিলা প্রতিবাদকারীদের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয় বলে সিয়াসত জানিয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, আটক ও মুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তবে সংবাদপত্রটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বিবৃতিতে এসিপির বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হেনস্থার নির্দিষ্ট অভিযোগের উল্লেখ ছিল না। ফলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে পুলিশের জবাব এবং সাংবাদিকের মূল অভিযোগের নিষ্পত্তি—এই দুই বিষয়কে আলাদা করেই দেখতে হচ্ছে।
ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে সাংবাদিক সংগঠনগুলিও। ডিজিপাব নিউজ ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে এফআইআর, তাঁদের সাসপেনশন এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছে। প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া সাংবাদিকদের প্রতি পুলিশের আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ চেয়েছে। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের বলপ্রয়োগ ও আটকের মুখে পড়ার অভিযোগ। সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি তাই এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এখন মূল প্রশ্ন, অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছভাবে হবে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ, এফআইআর দায়ের না হওয়ার অভিযোগ এবং আটকদের মারধরের অভিযোগ—প্রতিটিরই পৃথক উত্তর প্রয়োজন। পুলিশের বক্তব্যও যাচাইয়ের অংশ। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, চিকিৎসা পরীক্ষার নথি ও ঘটনাস্থলের ফুটেজ সেই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অভিযোগকারী সাংবাদিক ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার বিবেচনার আগে অভিযোগটি যথাযথভাবে নথিভুক্ত করে সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া শুরু হোক। অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত, উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ পরীক্ষা করেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সামনে আনা এই অনুসন্ধানের প্রধান কাজ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



