যৌন অপরাধ ঠেকাতে দিনরাত নজরদারি সেল গড়ুন, দিল্লি পুলিশকে সুপ্রিম কোর্ট

যা জানা জরুরি
- নয়াদিল্লি : যৌন অপরাধ প্রতিরোধে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির জন্য চব্বিশ ঘণ্টার বিশেষ সেল গড়তে দিল্লি পুলিশকে বলল সুপ্রিম কোর্ট।
- সোমবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনসমাগমের জায়গাগুলিতে টহল বাড়ানোর উপরেও জোর দিয়েছে।
- আদালতের বক্তব্য, জনপরিসরে সিসিটিভি বসালেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নয়াদিল্লি : যৌন অপরাধ প্রতিরোধে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির জন্য চব্বিশ ঘণ্টার বিশেষ সেল গড়তে দিল্লি পুলিশকে বলল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনসমাগমের জায়গাগুলিতে টহল বাড়ানোর উপরেও জোর দিয়েছে। আদালতের বক্তব্য, জনপরিসরে সিসিটিভি বসালেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ক্যামেরার ছবি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সন্দেহজনক পরিস্থিতি চিহ্নিত করা এবং দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।
শুনানিতে বিচারপতিরা বোঝান, নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উপর। কোনও এলাকায় ক্যামেরা থাকলেও সেখানে কী ঘটছে, তা দেখার লোক না থাকলে বিপদের সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সেই কারণে সর্বক্ষণ সক্রিয় পর্যবেক্ষণকেন্দ্র প্রয়োজন। আদালত জানতে চায়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে একটানা নজর রাখার মতো ব্যবস্থা রয়েছে কি না। সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়ার পর ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ পৌঁছনোর প্রয়োজনও আলোচনায় উঠে আসে।
বেঞ্চের প্রধান উদ্বেগ, দিল্লির কিছু এলাকায় মহিলাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বিচারপতিরা বলেন, রাত দশটা বা এগারোটাতেও কোনও তরুণী কিংবা মহিলা রাস্তায় হাঁটলে অথবা মেট্রোয় যাতায়াত করলে যেন নিরাপদ বোধ করেন। সেই পরিবেশ তৈরিতে আদালত, সরকার এবং পুলিশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরে অভিযুক্তকে গ্রেফতারের দক্ষতার পাশাপাশি, অপরাধের সুযোগ কমানোর দায়িত্বও পুলিশকে পালন করতে হবে।
দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের খবরের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করেছে। ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে আস্থা কুঞ্জ পার্কে এক নাবালিকাকে গণধর্ষণের অভিযোগ, স্বরূপনগরে এক কিশোরীকে গণধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ এবং গ্রেটার নয়ডা থেকে দিল্লিগামী চলন্ত স্লিপার বাসে এক নাবালিকার উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। শেষের ঘটনায় বাসটি প্রায় ৪৭ কিলোমিটার গেলেও পুলিশ সেটিকে আটকাতে পারেনি বলে আদালতের নজরে আসে।
সোমবারের শুনানিতে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, মেট্রো স্টেশন, পার্ক এবং স্কুলকলেজের আশপাশে নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা উঠে আসে। বিশেষত পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তারক্ষী নেই, এমন পার্ক নিয়ে উদ্বেগ জানায় বেঞ্চ। স্থানীয় এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল বা বিট প্যাট্রোলিং জোরদার করার প্রয়োজনও তুলে ধরা হয়। আদালতনিযুক্ত সহায়ক আইনজীবী লিজ ম্যাথু টহলদারি এবং পুলিশবাহিনীর শূন্যপদের প্রসঙ্গ তোলেন। বেঞ্চ নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়।
এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরের আদেশে আদালত প্রতিটি পুলিশ জেলায় বিশেষ দল গড়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলি পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছিল। কোথায় আলো কম, কোথায় নজরদারি নেই, কোথায় টহল অপর্যাপ্ত, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়। অপরাধের তথ্য, স্থানীয় খবর, পুরনো অভিযোগ এবং পূর্ববর্তী ঘটনার ভিত্তিতে এলাকাগুলির ঝুঁকি চিহ্নিত করার কথা ছিল। পাশাপাশি জেলাভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করে সংলগ্ন থানাগুলির মধ্যে সেই তথ্য বিনিময়ের নির্দেশও দেওয়া হয়।
ওই আদেশে পার্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আলো এবং সিসিটিভির অবস্থা পরীক্ষা করতে বলা হয়েছিল। বিকল ক্যামেরা বা আলোর ব্যবস্থা দ্রুত মেরামত এবং প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত সরঞ্জাম বসানোর কথাও ছিল। প্রতিটি চিহ্নিত এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট আধিকারিকের উপর ন্যস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সোমবার আস্থা কুঞ্জ পার্কের সিসিটিভি, আলো এবং নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের বর্তমান অবস্থা নিয়েও জানতে চায় বেঞ্চ।
পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের প্রশ্নটিও এদিন গুরুত্ব পায়। বিচারপতি পারদিওয়ালা বলেন, মানুষ যেন পুলিশকে দেখে দূরে সরে না যান; বরং নিজেদের সমস্যা জানাতে এগিয়ে আসেন। পুলিশের আচরণে নাগরিকের আস্থা তৈরি হওয়া প্রয়োজন। আস্থা কুঞ্জের ঘটনার আগে অভিযোগ বা সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে। বেঞ্চের উদ্বেগ, নিরাপত্তার ঘাটতি যেন অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি না করে।
কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, বিষয়টি নিয়ে দিল্লি পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা থাকার পাশাপাশি সেটি কাজ করছে এবং ফল দিচ্ছে, তা দেখানোও প্রয়োজন। বেঞ্চও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপের উপর জোর দেয়। আসন্ন উৎসবের সময়ে অসামাজিক কার্যকলাপের আশঙ্কা উল্লেখ করে পুলিশকে আরও সতর্ক থাকতে বলে আদালত।
আগের আদেশে জরুরি সহায়তার নম্বর, মহিলা হেল্পলাইন, থানার মহিলা সহায়তা ডেস্ক এবং নির্যাতিতাদের সহায়তাকেন্দ্র কতটা কার্যকর, সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছিল। কোন পরিষেবা চালু রয়েছে, কত মানুষ তার আওতায় আসেন, দায়িত্বে কে রয়েছেন এবং সাড়া দিতে গড়ে কত সময় লাগে, তা জানাতে বলা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়নে ঘোষিত প্রকল্পের সঙ্গে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার এই যোগসূত্রকেই গুরুত্ব দিয়েছে আদালত।
বেঞ্চ অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের মধ্যে আইনি পরিণতির ভয় তৈরির প্রয়োজনের কথাও বলেছে। একই সঙ্গে এই স্বতঃপ্রণোদিত মামলার পরিসর নির্দিষ্ট রয়েছে: পৃথক অভিযুক্তের অপরাধ নির্ধারণের বদলে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং প্রতিরোধব্যবস্থা পরীক্ষা করা। আগের আদেশে আদালত জানিয়েছিল, নির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত ও অভিযুক্তের দোষ নির্ধারণ আইনানুগ প্রক্রিয়া এবং ন্যায়সংগত বিচারের মাধ্যমেই হতে হবে। আদালত আগেই মনে করিয়েছে, মর্যাদার সঙ্গে এবং হিংসার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষার অন্তর্গত। জনপরিসর নিরাপদ রাখার দায়িত্ব তাই রাষ্ট্র ও তার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির উপরেই বর্তায়।
দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের বক্তব্য নথিভুক্ত করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানি আপাতত ১৬ নভেম্বর নির্ধারিত রয়েছে। তার আগে নজরদারি, টহল এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করছে, তা আদালতের সামনে আসবে। রাজধানীতে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে এই মামলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ঘোষিত ব্যবস্থাগুলি কতটা বাস্তবে কাজ করছে এবং বিপদ দেখা দিলে কত দ্রুত সহায়তা পৌঁছচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



