একসময় ঊর্ধ্বতন কর্তারা অধস্তনদের নির্দ্বিধায় নিজেদের মত নথিবদ্ধ করতে দিতেন। সেই মত খারিজ করতে হলে করতেন আরও জোরালো, যুক্তিসংগত বক্তব্য দিয়ে। এখন কর্তারা চান ‘চিন্তার মিল’; আর রাজনৈতিক প্রভুরা চান ‘অনুগত আমলাতন্ত্র’।

আমাদের অনেককেই এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু আমরা শপথে বাঁধা নই; জনসেবকেরা বাঁধা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিযুক্ত হোন কিংবা মানুষের ভোটে নির্বাচিত, সরকারি পদে আসীন ব্যক্তিরা ‘ভারতের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য’ বজায় রাখার শপথ নেন। শপথ নেন, ‘ভয় বা পক্ষপাত, অনুরাগ বা বিদ্বেষের বশবর্তী না হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কর্তব্য পালন’ করার। গোপনীয়তা রক্ষার শপথেও তাঁরা বাঁধা। সেখানে বলা হয়, ‘নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের প্রয়োজন ছাড়া কোনও বিষয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে জানাব না বা তাঁদের কাছে প্রকাশ করব না।’ ভারী ভারী সব কথা। কিন্তু এই কথাগুলির ওজন ঠিক ততটাই, যতটা একজন ব্যক্তি অনুভব করতে বা বহন করতে প্রস্তুত।

কোনও জনসেবক যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখানে গোপনীয়তার শপথের সঙ্গে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের সংঘাত বাধে, তখন কী হয়? তিনি কি নিজের বিবেকের নির্দেশ মেনে চলেন? ইংল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আধিকারিক ক্লাইভ পন্টিংয়ের ঘটনাটি আমাদের সামনে আছে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ টর্পেডোর আঘাতে আর্জেন্টিনার যুদ্ধজাহাজ ‘জেনারেল বেলগ্রানো’ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পন্টিং দেখেন, কেন জাহাজটি ডোবানো হয়েছিল, সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সংসদকে ভুল তথ্য দিয়েছেন। তিনি সরকারি নথি ফাঁস করে দেন বিরোধী লেবার পার্টির সাংসদ ট্যাম ড্যালিয়েলের কাছে। গোপনীয়তার শপথ ভাঙার জন্য তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। বিচারকও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন। বিচারকের বক্তব্য ছিল, ‘রাষ্ট্রের স্বার্থ’ আর সেই সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের স্বার্থ সমার্থক। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জুরি সেই রায় উল্টে দেয়। তাদের অভিমত ছিল, সরকারি কর্মচারীদের অঙ্গীকার সংবিধানের কাছে। সেই অঙ্গীকার পালন করতে গিয়ে কোনও আইনের বিধান ভাঙা অপরাধ নয়। সত্য প্রকাশ করে পন্টিং আসলে নিজের শপথ, দেশের মানুষ এবং সংসদের প্রতি তাঁর মৌলিকতম দায়বদ্ধতাই পালন করেছিলেন। [১]

নৈতিক সংকটের সামনে দাঁড়ালে বিবেকের ডাক আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখায়। কিন্তু বাস্তববুদ্ধি হয়তো অন্য পরামর্শ দেয়। স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে। সেই সতর্কতাই মানুষকে ভীরু করে তোলে, ‘কাপুরুষ’ করে তোলে। নিজের অন্তরের তাগিদ দমন করে সে মেনে চলে সেই আপ্তবাক্য: সাহসের চেয়েও বড় গুণ বিচক্ষণতা। যাঁরা বিবেকের নির্দেশ মেনে চলতে চান, তাঁদের বুঝতে হবে, এই পথের চারটি ধাপ আছে। উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছতা; সেই উদ্দেশ্য সঠিক, এই দৃঢ় বিশ্বাস; কাজ করার সাহস; এবং নিজের কাজের পরিণতি বহন করার ক্ষমতা। বিবেকের পথে চলার মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকলেই সত্য শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আসলে অপ্রীতিকর পরিণতির জন্য প্রস্তুত না থাকলে, কিংবা নিজের কাজের জন্য বাহবা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলে, বিবেকের নির্দেশ মেনে চলা কঠিন। নৈতিক আচরণের বিষয়টি তখন আরও জটিল হয়ে ওঠে। কেনিয়ার দৌড়বিদ আবেল মুতাই ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন। সেই বছরেরই পরে স্পেনে তিন হাজার মিটার বাধাদৌড়ে অংশ নেন তিনি। দৌড়ে এগিয়েও ছিলেন। কিন্তু স্প্যানিশ ভাষায় লেখা নির্দেশ বুঝতে না পেরে, দৌড় শেষ হয়ে গিয়েছে ভেবে শেষসীমার কয়েক মিটার আগেই থেমে যান। [২]

তাঁর পিছনে ছিলেন স্পেনের দৌড়বিদ ইভান ফের্নান্দেস। তিনি বুঝতে পারেন, মুতাই ভুল করেছেন। তাঁকে টপকে এগিয়ে যাওয়ার বদলে তিনি মুতাইকে আরও কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দৌড় শেষ করতে সাহায্য করেন, যাতে জয়টা তাঁরই হয়। ইভান মনে করেছিলেন, জয়ের প্রকৃত দাবিদার মুতাই। প্রতিদ্বন্দ্বীর ভুলের সুযোগ নিতে তাঁর বিবেক সায় দেয়নি। কিন্তু তাঁর প্রশিক্ষক সমালোচনা করেন। বলেন, ইভানের মধ্যে যে কোনও মূল্যে জেতার সেই মরিয়া তাগিদ নেই, যা একজনকে সেরার আসনে বসায়। কেন তিনি এমন করলেন, জানতে চাওয়া হলে ইভানের সরল উত্তর ছিল, ‘মায়ের সামনে মুখ দেখাতাম কী করে?’ বিবেকের নির্দেশ মেনে চলার উদ্দেশ্য জয়ী হওয়া নয়। উদ্দেশ্য এমন কাজ করা, যা অন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, অনুসরণ করার ইচ্ছা জাগায়।

এই ‘মা’ আসলে বিবেকেরই আর এক নাম। জনসেবকদের কাছে সেই ‘মা’ হলেন দেশের মানুষ। জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার অর্থ তাই নিজের বিবেককেই বিসর্জন দেওয়া। আজ ভারতে জনসেবার অন্যতম বড় সংকট হল, ‘জনস্বার্থ’ কথাটির অর্থ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে; তার প্রতি দায়বদ্ধতাও শিথিল হয়েছে। সরকারি আধিকারিকদের নিজের পক্ষে রেখে নির্বাচনে জেতাই যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠে, তখন জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।

যা করা হচ্ছে তা বেআইনি, কেবল তখনই যে বিবেকের নির্দেশ মেনে চলার প্রয়োজন দেখা দেয়, এমন নয়। কোনও কাজ আইনের বিচারে বৈধ হলেও যখন তা আইনের মূল চেতনার বিরোধী, তখনও এই প্রয়োজন দেখা দেয়। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য যখন দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ বলি দেওয়া হয়, তখনও বিবেকের ডাক শুনতে হয়। বিবেককে বিসর্জন দেওয়ার অর্থ, জনসেবকেরা হয় জনস্বার্থ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, অথবা একান্তভাবেই দুর্নীতিতে নিমগ্ন।

বেআইনি কাজের বিরোধিতা করা তুলনায় সহজ, কারণ আইন তখন আপনার পাশে থাকে। যদিও সেই বিরোধিতা ক্ষমতাসীনদের কায়েমি স্বার্থে, কিংবা ক্ষমতার আড়ালে থাকা প্রকৃত ক্ষমতাধরদের স্বার্থে আঘাত করলে তারও মাশুল দিতে হতে পারে। জনজীবনের মূল্যবোধে যেন আমূল বদল ঘটে গিয়েছে। একসময় সৎ মানুষকে আদর্শ বলে মানা হত। এখন ব্যবস্থার পক্ষে অসুবিধাজনক বলে তাঁকে একঘরে করা হয়। আগে এমন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, যাঁরা নীতিনিষ্ঠ মানুষের ‘ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া’ কাজ করাকে প্রশংসা করতেন, কিংবা অন্তত তাতে আপত্তি করতেন না। নির্দেশিত পথে না চলার বাস্তব ও আশঙ্কিত ঝুঁকি যত বেড়েছে, ‘বিবেক’ ততই হয়ে উঠেছে এমন এক অপ্রয়োজনীয় বোঝা, যা না থাকলেই চলে।

একসময় ঊর্ধ্বতন কর্তারা অধস্তনদের স্বাধীনভাবে নিজেদের মত নথিবদ্ধ করতে দিতেন। সেই মত খারিজ করতে হলে করতেন আরও জোরালো, যুক্তিসংগত বক্তব্য দিয়ে। এখন কর্তারা চান ‘চিন্তার মিল’। রাজনৈতিক প্রভুরা চান ‘অনুগত আমলাতন্ত্র’। সেখানে ‘কেন’ প্রশ্ন করার অধিকার নেই। বরং মন্ত্র হল, ‘কিছু কোরো না, মরে থাকো’। অর্থাৎ, কিছুই না করে পড়ে থাকো; কিছু করতে গেলেই শাস্তির ঝুঁকি, আর কপালে জুটবে ‘পথভ্রষ্ট’, ‘ভিন্নমতাবলম্বী’ অথবা ‘এই ব্যবস্থায় বেমানান’ তকমা।

কারও বিবেকনিষ্ঠাকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে বাধা বলে মনে হলে, তাঁর প্রতি ব্যবস্থার সহিষ্ণুতা ক্রমেই কমে যায়। উচ্চপদে নিয়োগের উপযুক্ত তালিকা তৈরির জন্য সরকারি আধিকারিকদের যে ‘৩৬০ ডিগ্রি মূল্যায়ন’ করা হয়, তার বর্তমান প্রয়োগ বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়নকে কার্যত নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু লোককে বেছে নেওয়া হয় মতামত দেওয়ার জন্য। ব্যবস্থার চাকায় ‘ঝামেলাহীন’ একটি যন্ত্রাংশ হয়ে থাকার তথাকথিত গুণগুলি সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের আছে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের বিচ্ছিন্ন মন্তব্যকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভীরুরাই তখন নতজানুদের যোগ্যতার জামিনদার।

এবার শপথের কথাগুলিকে উল্টে দেখার সময় এসেছে। জনসেবকদের দুর্বল ও বিপন্ন মানুষের ‘পক্ষ’ নিতে হবে। আর ‘ভয়’ পেতে হবে নিজের বিবেককে—মানুষের নিজস্ব সংবিধানের সেই ‘অদৃশ্য’, ‘ঝামেলাবাজ’ অংশটুকু যদি তাঁরা এখনও বাঁচিয়ে রেখে থাকেন। উর্দু কবি কৃষ্ণবিহারী ‘নূর’ লিখেছিলেন: ‘জমির কাঁপ তো জাতা হ্যায়, আপ কুছ ভি কহিয়ে, ও হো গুনাহ সে পহলে কি হো গুনাহ কে বাদ।’

অর্থাৎ, আপনি যা-ই বলুন, বিবেক কেঁপে ওঠেই—পাপ করার আগে হোক, কিংবা পরে।