নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধীর অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে খারিজ করল বিজেপি। শনিবার কমিশনের তিন সদস্যের বৈঠকের পরে প্রকাশিত বিবৃতিকে সামনে রেখে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের দাবি, কংগ্রেসের অপপ্রচার ধরা পড়ে গিয়েছে। কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিরোধীরা যে আক্রমণ শানাচ্ছেন, তা দুর্ভাগ্যজনক। বিশেষত রাহুলের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করে তিনি কমিশনের ব্যাখ্যাকেই নিজেদের অবস্থানের পক্ষে তুলে ধরেন।

বিরোধীদের উদ্দেশে প্রসাদের পরামর্শ, মানুষের কাছে গিয়ে পরিশ্রম করে নির্বাচনে জয়ী হতে হবে। কেরল, হিমাচল প্রদেশ ও তেলঙ্গানায় কংগ্রেসের জয়ের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস জিতলে কমিশন, ভোটার তালিকা কিংবা বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না; পরাজয় ঘটলেই বিরোধীরা হইচই শুরু করেন। রাহুল কেন মিথ্যা বলেছেন, তার ব্যাখ্যাও দাবি করেন বিজেপি নেতা।

এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পরে বিরোধীরা কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শনিবার দিল্লির নির্বাচন সদনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী বৈঠকে বসেন।

প্রসাদের বক্তব্য, ওই বৈঠকের পরে কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি তিন সদস্যের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছিল। কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতামত বা পরামর্শ দেওয়া এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করা এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সর্বসম্মতির এই দাবিকে সামনে রেখেই বিরোধীদের অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি।

সুপ্রিম কোর্টের প্রসঙ্গও টানেন প্রসাদ। তাঁর দাবি, কংগ্রেস, সিপিএম ও তৃণমূলের আপত্তি শোনার পরেই সর্বোচ্চ আদালত এসআইআরকে বৈধ বলেছে। নতুন ভোটারের নাম তোলার ছয় নম্বর আবেদনপত্র নিয়েও অকারণ বিতর্ক হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রসাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় আদালতের অনুমোদন রয়েছে। কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারির দাবি তোলার জন্যও বিরোধীদের সমালোচনা করেন তিনি।

প্রসাদ আরও বলেন, নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব কমিশনের। ভোটার তালিকার এমন সংশোধন অতীতেও হয়েছে। রাহুলের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে কটাক্ষ করে তাঁর অভিযোগ, রাফাল-সহ বিভিন্ন বিষয়ে কংগ্রেস নেতার প্রচার শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কমিশনকে উদ্দেশ করে রাহুল যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তারও সমালোচনা করেন প্রসাদ। পাশাপাশি তাঁর আশ্বাস, কাউকে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না।

একই দিনে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিৎ পাত্রও রাহুলকে নিশানা করেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ্য যে কোনও মূল্যে ক্ষমতায় ফেরা। কমিশনের ব্যাখ্যা এবং তিন সদস্যের ঐকমত্য সত্ত্বেও আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক অপরিণতবোধের পরিচয় বলে দাবি করেন পাত্র। তাঁর মতে, নির্বাচনে জিততে না পারার হতাশা থেকেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রমণ করছে কংগ্রেস।

পাত্র আরও অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালের পর থেকে কংগ্রেস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করেছে। সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রমাণ চাওয়া থেকে সর্বোচ্চ আদালতের সমালোচনা—বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপরে এ ধরনের আক্রমণ দেশের মানুষ মেনে নেবেন না।

কমিশনের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীনও। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে বিরোধীরা; রাজনৈতিক দলগুলির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা উচিত। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও কমিশনের বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে ওঠা উদ্বেগের জবাব এতে দেওয়া হয়েছে।

তবে কমিশনের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় কংগ্রেস। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের অভিযোগ, মূল প্রশ্নগুলির উত্তর এড়িয়ে ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য, সংবাদপত্রের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেনি কমিশন; বরং বিতর্কের গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে চেয়েছে। ফলে বিজেপি বিবৃতিটিকে রাহুলের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের হাতিয়ার করলেও কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত থামেনি।