Table of Contents
ধর্ম নয়, নাগরিকত্বই হোক আইনের ভিত্তি—ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code বা UCC) চালুর পক্ষে ফের সরব হলেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর যুক্তি, ধর্মভিত্তিক পৃথক ব্যক্তিগত আইন নারীদের প্রতি বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
তসলিমার মতে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নাগরিকের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়, নাগরিকত্ব দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত। সেই কারণেই বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ কিংবা ভরণপোষণের মতো দেওয়ানি বিষয়ে ধর্মভেদে পৃথক আইন থাকা সমতার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাঁর বক্তব্য, আইন যদি নাগরিকের ধর্ম অনুযায়ী বদলে যায়, তাহলে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন।
ধর্মীয় আইন বনাম সমান অধিকার
ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক চলছে। সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বাস্তবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইন, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন।
তসলিমা অবশ্য এই বিতর্ককে মূলত ধর্মীয় অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে নারাজ। তাঁর মতে, আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত নারী-পুরুষের সমানাধিকার।
তাঁর যুক্তি, ব্যক্তিগত আইনের কিছু বিধান এখনও নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। তাই ধর্মের নাম করে সেই বৈষম্য টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নেই।
তসলিমার মতে, UCC কোনও একটি ধর্মের আইন অন্য সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়। বরং সংবিধানের সমতা ও নাগরিক অধিকারের মূল্যবোধের ভিত্তিতে সকলের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ-পাকিস্তানেও একই দাবি
ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গও টেনেছেন তসলিমা।
তাঁর দাবি, এই দুই দেশেও ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের কারণে বিশেষ করে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখে পড়েন। উত্তরাধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ, বহুবিবাহ কিংবা সন্তানের অভিভাবকত্বের মতো বিষয়ে সমানাধিকারের প্রশ্ন এখনও বিতর্কের কেন্দ্রে।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলিতেও আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমঅধিকারভিত্তিক দেওয়ানি আইন প্রয়োজন বলে মত তাঁর।
নারীর অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বহু বছর ধরেই সরব তসলিমা নাসরিন। তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখালেখি যেমন তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে, তেমনই মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের সমর্থনও পেয়েছে। UCC নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যও সেই দীর্ঘদিনের অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।
বিরোধীদের আপত্তি কোথায়?
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধীদের যুক্তি, ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক দেশে একক দেওয়ানি আইন চালু করার আগে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা ও ঐকমত্য জরুরি।
তাঁদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত পরামর্শ ছাড়া এমন আইন কার্যকর করা হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে। ব্যক্তিগত আইন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে UCC-র সমর্থকদের বক্তব্য, ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা দেওয়ানি আইন রাখার পরিবর্তে সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তসলিমার বার্তা স্পষ্ট
তসলিমা নাসরিনের বক্তব্যে তাই বিতর্কের মূল প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে—আইনের ভিত্তি কি ধর্ম হবে, নাকি নাগরিক অধিকার?
তাঁর অবস্থান স্পষ্ট: ধর্ম নয়, নাগরিকত্বই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের দেওয়ানি আইনের ভিত্তি।
তাঁর মতে, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—তিন দেশেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমান দেওয়ানি আইন প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং লিঙ্গসমতার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।