Table of Contents
হাইলাইটস
- তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ও বিস্তার মূলত একজন নেত্রীকে কেন্দ্র করে।
- দল হিসেবে তৃণমূল কতটা শক্তিশালী, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতটা শক্তিশালী—এই দুই প্রশ্ন আজ আলাদা করা কঠিন।
- ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক দলগুলির সবচেয়ে বড় সংকট হল উত্তরাধিকার ও প্রতিষ্ঠান গঠনের ব্যর্থতা।
- সমালোচকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যই আজ তৃণমূলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
- প্রতিষ্ঠাতা নেতার ছায়া এতটাই বড় হয়ে উঠেছে যে দল তার বাইরে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে পারেনি।
ভারতীয় রাজনীতিতে এমন অনেক নেতা আছেন যাঁরা দল গড়েছেন। কিন্তু খুব কম নেতার ক্ষেত্রেই দল এবং নেতা এতটা একাকার হয়ে গিয়েছে, যতটা হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে।
তৃণমূলের ইতিহাস লিখতে বসলে প্রথম অধ্যায়, মধ্যবর্তী অধ্যায় এবং শেষ অধ্যায়—সব জায়গাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ফিরে আসে। দলটির জন্ম তাঁর হাতে, উত্থান তাঁর নেতৃত্বে, ক্ষমতা দখল তাঁর আন্দোলনের ফল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের সাফল্যের কৃতিত্বের সবচেয়ে বড় অংশ তাঁরই প্রাপ্য।
কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্মম নিয়ম আছে। যে ব্যক্তি একটি সংগঠন তৈরি করেন, তিনি যদি সেই সংগঠনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন, তাহলে একসময় সেই সংগঠন নিজস্ব জীবনশক্তি হারাতে শুরু করে।
আজ তৃণমূলকে ঘিরে যে সংকটের আলোচনা হচ্ছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্ন।
দল বড়, না নেত্রী বড়?
সিপিএমের ক্ষেত্রে মানুষ জ্যোতি বসুকে চিনত, কিন্তু সিপিএমকে শুধু জ্যোতি বসুর দল বলে ভাবত না। বিজেপির ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদী সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ হলেও বিজেপি মোদীর ব্যক্তিগত দল নয়।
তৃণমূলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
দীর্ঘদিন ধরে দলের সমস্ত রাজনৈতিক বার্তা, নির্বাচনী কৌশল, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং জনসংযোগ কার্যত একজন মানুষের উপর নির্ভর করেছে। তৃণমূলের ভোটারদের বড় অংশের কাছে দল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুনতে এটি রাজনৈতিক শক্তির লক্ষণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর উল্টো দিকও আছে।
যখন দল এবং নেতা একই জিনিস হয়ে যায়, তখন নেতার সমস্যাই দলের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিষ্ঠানের বদলে ব্যক্তির উপর নির্ভরতা
রাজনৈতিক দল দীর্ঘস্থায়ী হয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারলে।
দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো, মতাদর্শ, নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া—এসব একটি দলকে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখে।
তৃণমূলের সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে দলটি কখনও প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি।
বরং প্রতিটি সংকটের সমাধান এসেছে উপরের স্তর থেকে। প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের উৎস থেকেছে একটিই কেন্দ্র।
ফলে মাঠের কর্মী থেকে জেলা নেতৃত্ব পর্যন্ত অনেকেই সংগঠনের চেয়ে নেতৃত্বের আশীর্বাদের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন।
এই ধরনের কাঠামো দ্রুত সাফল্য এনে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিপজ্জনক।
উত্তরাধিকার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা
যে কোনও ব্যক্তিনির্ভর দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উত্তরাধিকার।
একজন নেতা যখন কয়েক দশক ধরে দলের একমাত্র মুখ হয়ে থাকেন, তখন তাঁর পর কে?
আরও বড় প্রশ্ন হল—কেন?
অর্থাৎ নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা কেন তৈরি হবে, যদি দলের সমস্ত বৈধতা একজন মানুষের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বহু দল সংকটে পড়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু আঞ্চলিক দল প্রতিষ্ঠাতার পরবর্তী সময়ে ভাঙন, বিদ্রোহ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়েছে।
তৃণমূলের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কার কথা প্রায়শই শোনা যায়।
মমতার সবচেয়ে বড় সাফল্যই কি সবচেয়ে বড় দুর্বলতা?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরি করেছিলেন, যা একসময় বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনকে পরাজিত করেছিল।
তিনি এমন একটি জনভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, যা গ্রাম থেকে শহর, নারী থেকে সংখ্যালঘু, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত—বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত ছিল।
কিন্তু সেই ব্র্যান্ড এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে দল নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ার সুযোগই পায়নি।
ফলে আজ যদি কেউ তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে তাঁকে আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েই আলোচনা করতে হয়।
এটাই ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির অন্তর্নিহিত সংকট।
জন্মের মধ্যেই কি লুকিয়ে ছিল পতনের বীজ?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সময় দেয়নি।
তৃণমূল আজও একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। তার সংগঠন, ভোটব্যাঙ্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, দলের বর্তমান সংকটের শিকড় নতুন নয়।
যে দিন দলটি একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, সেদিনই তার ভবিষ্যৎ শক্তি এবং ভবিষ্যৎ দুর্বলতা—দুটির বীজ একসঙ্গে রোপিত হয়েছিল।
কারণ ইতিহাস বলে, কোনও নেতা যত বড়ই হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিত্বের জাদু একসময় ফিকে হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান থাকলে দল বেঁচে যায়।
প্রশ্ন হল, তৃণমূল কংগ্রেস কি কখনও সেই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছে?
নাকি দলটি এখনও একটি নামের উপর দাঁড়িয়ে আছে?
যদি দ্বিতীয় উত্তরটি সত্যি হয়, তাহলে তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দল নয়, নির্বাচনী পরাজয়ও নয়—বরং নিজের জন্মগত চরিত্র। কারণ যে দল একজন মানুষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, সেই মানুষটিই একসময় তার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা—দুটোই হয়ে উঠতে পারেন।