নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা: সোনারপুরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ঘটনার রেশ এখানেই শেষ হয়নি, তাঁর চিকিৎসা নিয়েও এক নজিরবিহীন জটিলতা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, চিকিৎসকদের ওপর ক্রমাগত হুমকি ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করার কারণে শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে অভিষেককে রিলিজ করিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আজ এক আবেগঘন ও বিস্ফোরক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বিজেপি সরকার, পুলিশ প্রশাসন ও সিআইডির ভূমিকা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলেছেন। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই হামলার প্রতিবাদে আগামী ২রা জুন থেকে কলকাতার রানী রাসমণি রোডে বড়সড় রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সোনারপুরের ঘটনার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে অবিলম্বে আইটিইউ (ITU) বা ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিটে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অভিযোগ, নতুন বিজেপি সরকারের পুলিশ প্রশাসন ও উচ্চপদস্থ কর্তারা এই খবর পেয়েই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের ওপর অনৈতিকভাবে মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেন। ক্রমাগত ফোন করে অভিষেককে হাসপাতালে ভর্তি না রাখার জন্য রীতিমতো হুমকি দেওয়া হতে থাকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, চিকিৎসকদের এই অসহায় অবস্থা দেখে এবং তাঁদের চাকরি বাঁচানোর স্বার্থে সমস্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না করেই অভিষেককে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে শান্তিতে চিকিৎসা করানোর জন্য তাঁর বাড়িতেই বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে এনে এবং ফ্যামিলি ডক্টরের কড়া নজরদারিতে তাঁর বাড়িতেই এখন এক প্রকার ‘মিনি হাসপাতাল’ তৈরি করে চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে অভিষেকের চোখের পুরনো জটিল সমস্যার কারণে এই ধরণের শারীরিক ধকল ও চোট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং মেডিকেল রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, চোটের গভীরতা অত্যন্ত মারাত্মক। তাঁর সারা শরীরে, বিশেষ করে মুখে, হাত-পায়ে এবং বুকের চারপাশে চাকা চাকা রক্তের দাগ ও কালশিটে পড়ে গেছে। তিনি ক্রমাগত মাথা ঘুরছেন এবং তাঁর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার মারাত্মকভাবে ওঠানামা করছে। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, সোনারপুরে যেভাবে পরিকল্পনা করে চারপাশ থেকে পাথর ছোড়া হয়েছিল, তাতে পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারত। স্থানীয় কিছু যুবক যদি শেষ মুহূর্তে বুদ্ধিমত্তা দেখিয়ে হেলমেট দিয়ে অভিষেকের মাথা ঢেকে না দিত, তবে হয়তো ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু (স্পট ডেথ) হতে পারত। যুবকদের এই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি তাঁদের ধন্যবাদ জানান।
এই ঘটনার পেছনে পুলিশ এবং সিআইডির ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে পুলিশকে আগে থেকে সমস্ত তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এই ধরণের হামলা ঘটতে পারল? তাঁর দাবি, এই হামলায় যুক্ত দুষ্কৃতীরা কেউ স্থানীয় বাসিন্দা নয়, বরং বাইরে থেকে মোটা টাকায় ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছিল। পুলিশ প্রশাসন তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। এর পাশাপাশি, হামলার দিনই অভিষেকের বাড়িতে সিআইডি (CID) পাঠিয়ে নোটিশ টাঙানোর ঘটনাকে তিনি ‘কাপুরুষোচিত’ এবং ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বলে তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার চেয়ারে কেউ চিরকাল থাকে না, কিন্তু এই ধরণের অমানবিক আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।
সোনারপুরের এই ঘটনার পর জাতীয় রাজনীতিতেও শোরগোল পড়ে গেছে। ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের একাধিক শীর্ষ নেতা তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব সহ জাতীয় স্তরের বহু নেতা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। তবে এই ভয়ের পরিবেশের সামনে তৃণমূল যে মাথা নত করবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সাফ জানান, এই হিংসা বা ভয়ের রাজনীতির উত্তর তারা কোনো গণ্ডগোলের মাধ্যমে দেবেন না। দেশের সাধারণ মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে, অর্থাৎ ভোটের বাক্সে এই অমানবিকতার যোগ্য বিচার করবে। একই সাথে, আগামী ২রা জুন থেকে কলকাতার রানী রাসমণি রোডে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যে বিশাল প্রতিবাদী কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, তা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জবাব হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।