নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তার পাশে দাঁড়াল বিজেপির একাধিক শরিক দল। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসার পরে শুক্রবার জনসাধারণের সংশয় দূর করার দাবি জানিয়েছিল তারা। শনিবার কমিশনের বৈঠক ও বিবৃতি প্রকাশের পরে তেলুগু দেশম, লোক জনশক্তি পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চা জানাল, ব্যাখ্যায় তারা সন্তুষ্ট। জনতা দল ইউনাইটেড আরও এক ধাপ এগিয়ে বিরোধীদের ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে।

অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা তেলুগু দেশম প্রধান এন চন্দ্রবাবু নায়ডুর বক্তব্য, তিন সদস্যের সম্মতিতে দেওয়া এই ব্যাখ্যা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনে। কমিশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভুল ধারণাও এতে দূর হয়েছে বলে দাবি তাঁর। নায়ডুর প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ঐকমত্যের বিষয়টি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর যৌথ অবস্থানকেই তিনি প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আস্থা দুর্বল করার চেষ্টা দুর্ভাগ্যজনক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনবিশ্বাস বজায় রাখার দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) প্রধান চিরাগ পাসোয়ানের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে কমিশন পৃথকভাবে নিজের অবস্থান জানিয়েছে। এসআইআর পদ্ধতি, তিন কমিশনারের ঐকমত্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গ স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই ব্যাখ্যা গণতন্ত্রের উপর মানুষের বিশ্বাস মজবুত করবে।

রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চার প্রধান উপেন্দ্র কুশওয়াহাও কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে আগের দিন ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কমিশনের তরফে এখন বিষয়গুলি পরিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অসত্য প্রচারকারীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জনতা দল ইউনাইটেডের কার্যকরী সভাপতি সঞ্জয় ঝা অভিযোগ করেছেন, এসআইআর নিয়ে কমিশনের মধ্যে ঐকমত্য নেই বলে বিরোধীরা ভুল ধারণা ছড়াচ্ছিল। তাঁর দাবি, নতুন বিবৃতি সেই প্রচারের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বিরোধীদের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে শরিকদের সকলের প্রতিক্রিয়া এক সুরে বাঁধা নয়। জনতা দল সেকুলার নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী বলেছেন, কমিশনের ভিতরে কী ঘটছে, সংবাদমাধ্যমে যা দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার সম্পর্ক কী, তা সদস্যদেরই স্পষ্ট করে জানাতে হবে।

এই সমর্থনের তাৎপর্য বোঝাতে আগের দিনের প্রতিক্রিয়াগুলি প্রাসঙ্গিক। শুক্রবার চিরাগ বলেছিলেন, নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়েই মানুষের সন্দেহ জন্মালে তা উদ্বেগজনক। কমিশনের জবাব দেওয়ার দায় সাধারণ মানুষের কাছে। সরকারের শরিক হিসেবে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে সওয়াল করা তাঁর উদ্দেশ্য নয় বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ভোটের ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা।

তেলুগু দেশমের লোকসভার নেতা লাভু শ্রীকৃষ্ণ দেবরায়ালুও অন্ধ্রপ্রদেশে এসআইআর স্বচ্ছভাবে হয়েছে বলে দাবি করেও ব্যাখ্যার প্রয়োজন মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, গণতন্ত্রে গুরুদায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে উপযুক্ত উত্তর ও স্বচ্ছতা মানুষের বিশ্বাস বাড়ায়। কুশওয়াহা আরও সরাসরি বলেছিলেন, কমিশনের কাজকর্মে কিছু সমস্যা রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে; ওঠা প্রশ্ন ও উদ্বেগের জবাব দেওয়া প্রয়োজন।

বিতর্কের সূত্র একটি প্রতিবেদনের অনুসন্ধান। সংবাদপত্রটি জানায়, দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার সান্ধু ও জোশী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে লিখিত আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের অজ্ঞাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও ছিল। কমিশন প্রথম প্রতিক্রিয়ায় মতপার্থক্যকে আলোচনাপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ বলে বর্ণনা করে। সদস্যদের মন্তব্য, পরামর্শ ও অভ্যন্তরীণ যাচাইকে নিয়মিত কাজের অঙ্গ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

কমিশনের নতুন বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসআইআরের নির্দেশগুলি সর্বসম্মত অনুমোদনেই জারি হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে পাঠানো চিঠি সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, সেটি কোনও নীতিগত বিষয় বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নীতি নিয়ে ছিল না; কমিশনে প্রেষণে কর্মরত এক আধিকারিকের কাজকর্ম সংক্রান্ত ছিল। ওই আধিকারিকের জারি করা বিতর্কিত কাজ বণ্টনের নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলেও জানানো হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রও ভুবনেশ্বরে এই ব্যাখ্যাকে বিরোধীদের অভিযোগের জবাব হিসেবে তুলে ধরেছে।

শনিবারের বৈঠকের পরে কমিশন যে পরিবর্তনগুলি ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে রয়েছে বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি পাঠানো এবং পরে কার্যবিবরণী প্রকাশ। ভোটার তালিকা পরিচালনার বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা ইসিআইনেট পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আগে আধিকারিকদের কমিটিতে যাচাই করে কমিশনের সামনে আনা হবে। কমিশনারদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালনের কথাও বিবৃতিতে রয়েছে। দুই সদস্যের তোলা একাধিক উদ্বেগের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তগুলির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বিরোধীরা অবশ্য শরিকদের সন্তুষ্টির সঙ্গে একমত নয়। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, কমিশন অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেনি; বরং বিতর্কের ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। পবন খেরার বক্তব্য, নতুন ভোটারদের নাম তোলার ছয় নম্বর আবেদনপত্রে পরিবর্তন নিয়ে দুই কমিশনারের আপত্তির নির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। ফলে বৈঠকের ঐকমত্য দেখিয়েই অতীতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা যায় না বলে দাবি কংগ্রেসের।

পশ্চিমবঙ্গের প্রশ্নটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। বিচারিক আধিকারিকদের নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে যে আপিলগুলি হয়েছিল, সেগুলির অনুমোদন কে দিয়েছিল এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেগুলি করা হয়েছিল কি না, নতুন বিবৃতিতে তার উত্তর নেই বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে। ছয় নম্বর আবেদনপত্রের অনলাইন সংস্করণে বিতর্কিত প্রশ্নটি সরানো হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। শরিকেরা ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেও এই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলি ঘিরে বিরোধ অব্যাহত।