বিজেপিকে বাংলা দখলে সাহায্য করতেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করেছিল নির্বাচন কমিশন। শনিবার হুগলির শ্রীরামপুরের জনসভা থেকে এমনই অভিযোগ তুললেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বৈধ ভোটারদের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তিনি জানিয়ে দেন, ওই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রতিবাদ চলবে। মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরে কলকাতার বাইরে এটিই ছিল মমতার প্রথম জনসভা।

কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, বিজেপি কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করেছে, সেই সত্য এখন সামনে এসেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কোনও নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ইচ্ছেমতো হরণ করা যায় না। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মমতার দাবি, বাংলায় ৯৩ লক্ষ মানুষের নাম হয় বাদ দেওয়া হয়েছে, নয়তো বিচারাধীন রাখা হয়েছে। যাঁদের নাম কাটা গিয়েছে, তাঁদের ক্ষতির জন্য সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবিও তোলেন তিনি। এই সংখ্যাটি মমতার বক্তব্যের অংশ; সমস্ত নাম চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছে বলে তিনি ওই বক্তব্যে দাবি করেননি। নির্বাচন আধিকারিক সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়েও তাঁদের দল আগেই প্রশ্ন তুলেছিল বলে জানান।

ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনেও অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন মমতা। তাঁর দাবি, বিজেপির সিলমোহর দেওয়া ৬ নম্বর ফর্ম একসঙ্গে বিপুল সংখ্যায় জমা দিয়েছেন দলের কর্মীরা। এই অভিযোগের প্রমাণ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানান তিনি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কটাক্ষ করে মমতা বুঝিয়ে দেন, কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আন্দোলন থেকে পিছু হটার প্রশ্ন নেই।

মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে আসন্ন উপনির্বাচনের প্রসঙ্গও ওঠে সভায়। মমতার অভিযোগ, সেখানকার পুলিশ শাসক বিজেপির হয়ে কাজ করছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ভোটার পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ভোট দেওয়ার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালানোর কথা বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল প্রশাসনের পক্ষপাত এবং ভোটারদের উপর চাপ সৃষ্টির বিষয়টি।

সভায় পৌঁছনোর পথে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেও সরব হন মমতা। উত্তরপাড়ায় কুণাল ঘোষের গাড়িতে হামলার প্রসঙ্গ তুলে বিজেপিকে দায়ী করেন তিনি। তাঁর দাবি, সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড়শো থেকে দু’শো জনকে আটক অথবা গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ কেন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করছে, সেই প্রশ্ন তোলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। বিরোধীদের সভা করার অধিকার রয়েছে বলেও মনে করিয়ে দেন।

হকার উচ্ছেদ এবং মহিলাদের আর্থিক সহায়তার প্রশ্নেও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন মমতা। ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের পাশে দাঁড়িয়ে আদালতে লড়াইয়ের আশ্বাস দেন তিনি। অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধা পেতে মহিলাদের উপর নানা শর্ত চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও এখন সব মহিলা কেন আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন না।

কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে জাতীয় স্তরে নিয়ে যেতে বিরোধী ঐক্যের উপর জোর দেন মমতা। জানান, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে একসঙ্গে বৈঠকে বসার বার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত বিতর্ক এবং বিরোধীদের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

শ্রীরামপুরের সভায় মমতার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, নির্বাচনে পরাজয়ের সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই অভিযোগ সামনে রেখেই জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন তিনি। একই সঙ্গে ভোটাধিকার, বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির স্বাধীনতা এবং জীবিকার প্রশ্নকে সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রচারের কেন্দ্রে রাখেন।