বিশ্লেষণ

সংখ্যার আড়ালে সংকট: জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মামলা তুলছে আস্থার প্রশ্ন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে।
  • আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই আবেদন করেছেন, যেখানে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া পরিচালনায় বিধিবদ্ধ দায়িত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা…
  • এই পিটিশনে ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া, নির্বাচন কমিশন, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার, ক্যাবিনেট সচিব, মণীশ গর্গ এবং সীমা খন্নাকে প্রতিপক্ষ করা হয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই আবেদন করেছেন, যেখানে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া পরিচালনায় বিধিবদ্ধ দায়িত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটির নথিভুক্তি নম্বর ৫৯৭৩৪/২০২৬। এই পিটিশনে ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া, নির্বাচন কমিশন, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার, ক্যাবিনেট সচিব, মণীশ গর্গ এবং সীমা খন্নাকে প্রতিপক্ষ করা হয়েছে।

অভিযোগের ভিত্তি

আবেদনকারীর যুক্তি হল, ২০২৩ সালের ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার অ্যান্ড আদার ইসি অ্যাক্ট’-এর অষ্টাদশ ধারা অনুযায়ী কমিশনারদের মধ্যে মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই বিধি লঙ্ঘন করে যদি সফটওয়্যার পরিবর্তন, নির্দেশিকা জারি বা ফর্ম ছয়ের বিন্যাস বদলের মতো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেগুলি অসাংবিধানিক ও শূন্য বলে ঘোষণা করার দাবি তোলা হয়েছে। মামলায় সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩২ ধারায় এই আবেদন করা হয়েছে, যা নির্বাচনী তালিকা প্রস্তুতি বা সংশোধনে দায়িত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই ধারা অনুযায়ী মণীশ গর্গ, সীমা খন্না এবং দায়ী অন্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে। লক্ষণীয়, এই কৌশলের মধ্য দিয়ে আবেদনকারী বিষয়টিকে নিছক প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখছেন না, বরং ইচ্ছাকৃত দায়িত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে একটি প্রশাসনিক বিতর্ককে ফৌজদারি আইনের পরিসরে টেনে নিয়ে গেছেন।

তেরো কোটি ভোটার বিলোপের অভিযোগ

মামলার প্রকৃত ভরকেন্দ্র সংখ্যাতত্ত্বে। প্রায় তেরো কোটি ভোটারের নাম দেশের ত্রিশটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই মাপের বিয়োজন কোনও ছোটখাটো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। এত বড় সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার একসঙ্গে বিপন্ন হলে, তা গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানার সমান। তাই আবেদনকারী অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বা সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের দাবি তুলেছেন, যাতে ইসিআইনেট ও ইরোনেট ডেটাবেসের ফরেনসিক অডিট করা যায়। এই দাবিকে অতিরিক্ত বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম, কারণ প্রযুক্তিগত কারচুপির সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞতাই দরকার, স্রেফ প্রশাসনিক তদন্তে তা ধরা পড়বে না।

প্রমাণ সংরক্ষণ ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি

লক্ষণীয়, দাবিটি শুধু তদন্তেই থেমে থাকেনি— আবেদনকারী প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ইসিআইনেট ও ইরোনেট সংক্রান্ত সার্ভার লগ, ডেটাবেস, যোগাযোগ ও মেটাডেটা সংরক্ষণেরও আবেদন জানিয়েছেন, এবং একই সঙ্গে ইসিআইনেট/ইরোনেট পোর্টালে ফর্ম ছয়ের যে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা খারিজ করে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত পুরনো ফর্ম ছয় পুনর্বহালের দাবিও তুলেছেন। এই তিনটি দাবি একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, মামলাটির লক্ষ্য শুধু অতীতের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রক্রিয়াকেও পুরনো, প্রমাণিত কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা— অর্থাৎ এটি একটি প্রতিকারমূলক নয়, কাঠামোগত সংস্কারের দাবি।

পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গ: আপিলের রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই মামলার তাৎপর্য আরও গভীর। বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, এবং আগামী বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরের রাজনৈতিক ভাষ্যেই ইন্ধন জুগিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মামলাটি আরও একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছে— রাজ্যে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ১৬.১০ লক্ষ আপিল দায়ের হয়েছে বলে দাবি, যা নাকি নির্বাচন কমিশনের নামেই করা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক আপিল কার অনুমোদনে, কার উদ্যোগে দায়ের হল, তা স্পষ্ট না হওয়াটা কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে আসছে।

কমিশনের পাল্টা বক্তব্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে ফর্ম ছয় ও আট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং নাগরিকত্ব ঘোষণাপত্র সংক্রান্ত নির্দেশিকা সর্বসম্মতিক্রমেই অনুমোদিত হয়েছিল। কমিশন সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছিল বলে যে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই দুই বিপরীতমুখী বয়ানের মধ্যে সত্যতা যাচাই এখন আদালতের এক্তিয়ারে, কিন্তু বিষয়টি যেভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই জনমানসে সংশয় তৈরি হয়েছে— আর এই সংশয়টাই আসলে মামলার চেয়েও বড় সমস্যা, কারণ আদালতের রায় যাই হোক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার অভাব নিজেই একটি স্বতন্ত্র সংকট হিসেবে থেকে যাবে।

প্রেক্ষাপট: ভেতরকার ফাটল আদালতে

এই মামলা এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন একটি পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে যে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ সেই সিদ্ধান্তগুলি তাঁদের অজান্তে বা সুপারিশের বিপরীতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই বিরোধী দলগুলি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি জোরালো করে, এবং সমাজমাধ্যম-কেন্দ্রিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ককরোচ জনতা পার্টিও তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়। অর্থাৎ কমিশনের ভেতরকার এই ফাটল আর নিছক গুঞ্জন নয়— তা এখন আদালতের বিচার্য বিষয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

বৈধতা বনাম বাস্তবায়ন: একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মাথায় রাখা দরকার— চলতি বছরের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এসআইআর প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা বহাল রেখে জানিয়েছিল, এটি প্রতিনিধিত্ব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ফলে বর্তমান মামলাটি এসআইআরের নীতিগত বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে না— বরং তার বাস্তবায়নের পদ্ধতি, কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়েই কেন্দ্রীভূত। এই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটাই বলে দেয়, কেন এই মামলা আগের এসআইআর-বিরোধী মামলাগুলির থেকে আলাদা এবং কেন তা খারিজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় জিইয়ে রাখা মানেই প্রতিটি পরবর্তী নির্বাচনী ফলাফলের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন তৈরি হওয়া, যা কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে সুস্থ লক্ষণ নয়। এই মামলার নিষ্পত্তি তাই শুধু আইনি রায় নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি পরীক্ষাও বটে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles