নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা যেন এক লহমায় কাছাকাছি এনে দিল বাংলার রাজনীতির চিরকালীন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএমকে। সূত্রের খবর, শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির মধ্যে টেলিফোনে দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছে। দুই নেতা-নেত্রীর আলোচনায় উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলির একজোট হয়ে আন্দোলনে নামার প্রয়োজনীয়তা। এর পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা বলেছেন লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও, এবং আগামী সপ্তাহেই, সম্ভব হলে সোমবার বা মঙ্গলবার, ইন্ডিয়া জোটের একটি বৈঠক ডাকার আর্জি জানিয়েছেন তাঁর কাছে।

মমতা-বেবির এই ফোনালাপ হল এমন এক সময়ে, যখন এর দু’দিন আগেই সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক ইন্ডিয়া জোট তথা বিজেপি-বিরোধী দলগুলির নেতাদের চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাক্রম নিয়ে বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সকলকে কার্যত চমকে দিয়ে বৃহস্পতিবার বেবিকে পাল্টা জবাব দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন যে দেশে সত্যিকারের এক “অস্বাভাবিক পরিস্থিতি” তৈরি হয়েছে।

বেবির চিঠিতে যা ছিল

গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে বেবি তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন, ওই প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ববাদী কার্যপ্রণালীর বিস্ফোরক দিকটি প্রকাশ করে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের গণতন্ত্র সঙ্কটে পড়েছে, কারণ বিরোধীদের সমস্ত আপত্তি উপেক্ষা করে কমিশন এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) প্রক্রিয়া জোর করে চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তেরো কোটিরও বেশি ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে অবিলম্বে বিরোধীদের বৈঠকে বসা উচিত বলে মত দেন বেবি। তাঁর কথায়, দেশের মানুষ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভোটাধিকারের মতো মূল্যবোধ রক্ষার আশায় তাকিয়ে আছেন বিরোধীদের দিকেই। কীভাবে এই “অস্বাভাবিক পরিস্থিতি”র মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার জন্য সব দল মিলে একটি সুবিধাজনক দিন ও স্থান বেছে নিতে পারে বলেও তিনি প্রস্তাব দেন।

সূত্রের খবর, ইন্ডিয়া জোটের বাইরে থাকা বিআরএস, আপ, ডিএমকে, তামিলনাড়ুর শাসক দল টিভিকে, বিজেডি এবং ককরোচ জনতা পার্টির মতো দলগুলিকেও চিঠি লিখেছেন বেবি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেবিকে জানিয়েছেন যে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলির অবিলম্বে বৈঠকে বসে যৌথ কৌশল স্থির করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দল বেশ কয়েক বছর ধরেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাতের সম্পর্কে রয়েছে।

নেতাদের মধ্যে ক্রমাগত যোগাযোগ

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সংক্রান্ত অনুসন্ধান প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইন্ডিয়া জোটের নেতারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে সূত্রের খবর। ওই প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সন্ধু এবং বিবেক জোশী গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ সেই সিদ্ধান্তগুলি তাঁদের অজান্তে নেওয়া হয়েছিল এবং প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট গলদ ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদনের জবাবে নির্বাচন কমিশন জানায়, দুই কমিশনারের লিখিত মতামত তারা স্বীকার করছে, তবে সেগুলিকে কমিশনের “সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া”র অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু কমিশনারদের তোলা কোনও উদ্বেগের জবাব দেয়নি কমিশন, এমনকি সেগুলির সমাধানে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট করেনি।

বিরোধী দলগুলির দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে দিতে হবে, সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে কমিশনের কার্যপ্রণালীর নিরপেক্ষ তদন্ত করাতে হবে, এবং এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বৃহস্পতিবার বিরোধী দলগুলি সিদ্ধান্ত নেয়, সংসদে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে ফের নোটিস দেওয়া হবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বেবির এই কথোপকথন এমন একটা সময়ে হল, যখন কয়েক মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেস এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে। দলের বিধায়ক ও সাংসদ শাখার মধ্যে ভাঙন ধরার পর, এই মাসের গোড়ায় নির্বাচন কমিশন দলের প্রতীক ও নাম স্থগিত করে দেওয়ায় নতুন এক ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল।