রাজা নয়, জনতা

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: রাজা, যুদ্ধ আর প্রাসাদের ইতিহাসের আড়ালে কখনও কখনও উঠে আসে অন্য এক ইংল্যান্ড—কর দিতে দিতে ক্লান্ত মানুষ, কম মজুরিতে কাজ করা শ্রমিক, আর…
- সেই ইতিহাসই ১৩৮১ সালের কৃষকবিদ্রোহের পটভূমিতে নতুন করে লিখছেন এ কে ব্লেকমোর তাঁর উপন্যাস ‘ডুম পেইন্টিং’-এ।
- গ্রান্টার প্রকাশনা-তথ্য অনুযায়ী, বইটির হার্ডব্যাক সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কথা ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: রাজা, যুদ্ধ আর প্রাসাদের ইতিহাসের আড়ালে কখনও কখনও উঠে আসে অন্য এক ইংল্যান্ড—কর দিতে দিতে ক্লান্ত মানুষ, কম মজুরিতে কাজ করা শ্রমিক, আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ। সেই ইতিহাসই ১৩৮১ সালের কৃষকবিদ্রোহের পটভূমিতে নতুন করে লিখছেন এ কে ব্লেকমোর তাঁর উপন্যাস ‘ডুম পেইন্টিং’-এ।
গ্রান্টার প্রকাশনা-তথ্য অনুযায়ী, বইটির হার্ডব্যাক সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কথা ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ৬৭২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের ব্রিটিশ মূল্য ২০ পাউন্ড। ২২ সেপ্টেম্বর দ্য গার্ডিয়ান-এর পর্যালোচনায় ব্লেকমোরের ভাষার প্রশংসা যেমন রয়েছে, তেমনই চরিত্রায়ণ নিয়েও আপত্তি উঠেছে। অর্থাৎ বইটি ঘিরে আলোচনা শুরু হলেও প্রকাশের আগেই তাকে প্রকাশিত বই হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক নয়।
গল্পের শুরু এসেক্সের ব্রেন্টউডে। ছোটবেলার দুই বন্ধু সেখানে এক স্থানীয় বিচারকের সঙ্গে জনতার সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। করের চাপ, ক্ষমতার দাপট এবং সামাজিক অসন্তোষ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিদ্রোহে। মাত্র ১৬ দিনের সময়সীমায় কাহিনি এগোয় গ্রাম থেকে লন্ডনে—বিচ্ছিন্ন ক্ষোভ থেকে একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক দাবির দিকে।
এই বিদ্রোহের চরিত্ররাও সরল ছকে ধরা পড়ে না। তাঁদের অনেকে রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখলেও নিজেদের স্বাধীনতা সংকুচিত করা ধনী জমিদার ও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ফলে গল্পটি কেবল ‘রাজা বনাম বিদ্রোহী’ দ্বন্দ্বে আটকে থাকে না। প্রকাশকের বিবরণে ওয়াট টাইলারের নেতৃত্বে মানুষের লন্ডনযাত্রা এবং তরুণ রাজার সামনে দাবি পেশ করা কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এগুলি প্রকাশিত কাহিনিসূত্রের তথ্য; উপন্যাসের অপ্রকাশিত দৃশ্য বা সংলাপ এখানে অনুমান করা হচ্ছে না।
কবিতা এবং উপন্যাস—দুই ক্ষেত্রেই পরিচিত এ কে ব্লেকমোর। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ম্যানিংট্রি উইচেস’ ডেসমন্ড এলিয়ট পুরস্কার পেয়েছিল; দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য গ্লাটন’। অতীতের ক্ষমতা, ভয় এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন তাঁর লেখায় আগেও এসেছে। তবে আগের বইয়ের পুরস্কার নতুন বইয়ের মানের আগাম শংসাপত্র নয়। সাহিত্যিক সাফল্য আর প্রকাশনার তথ্য—দুটিকে আলাদা রেখেই বইটিকে দেখা জরুরি।
আর যে ইতিহাসের উপর উপন্যাসটি দাঁড়িয়ে, সেটিও ‘কৃষকদের বিদ্রোহ’ বলে এক কথায় শেষ করার মতো নয়। ‘দ্য পিপল অব ১৩৮১’ গবেষণা প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ‘পেজ্যান্টস রিভল্ট’ নামটি ঘটনাটির অনেক পরে, ১৮৭৪ সালে ইতিহাসবিদ জন রিচার্ড গ্রিনের লেখায় জনপ্রিয় হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শুধু দরিদ্র কৃষক ছিলেন না; কারিগর, শহরের মানুষ এবং তুলনামূলক সচ্ছল প্রজারাও যুক্ত হয়েছিলেন।
তাৎক্ষণিক ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল কর। ১৩৮০ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের উপর ১২ পেনির মাথাপিছু কর চাপানো হয়—চার বছরের মধ্যে তৃতীয় এমন কর। ধনী-গরিব নির্বিশেষে একই অঙ্ক দেওয়ার ব্যবস্থা অসন্তোষ আরও বাড়ায়। কিন্তু করই সব নয়। প্লেগের পরে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হলেও মজুরি ও কাজের শর্ত নিয়ন্ত্রণে আইন ছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতিও মানুষের ক্ষোভের পটভূমির অংশ হয়ে উঠেছিল।
জমির সঙ্গে যুক্ত বাধ্যতামূলক শ্রম ও অন্যান্য সেবার বদলে নির্দিষ্ট ভাড়ার দাবিও ক্রমশ জোরালো হয়। ১৫ জুন লন্ডনের স্মিথফিল্ডে রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ওয়াট টাইলার নিহত হন। এরপর বিদ্রোহ দমন করা হয় এবং দেওয়া কিছু স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিও প্রত্যাহার করা হয়। এগুলি ইতিহাসের নথিভুক্ত ধারাবাহিকতা; উপন্যাসে কোন ঘটনা কতটা জায়গা পাবে, সেটি অবশ্য লেখকের সাহিত্যিক সিদ্ধান্ত।
এই ইতিহাসের আরেকটি জটিলতা রয়েছে কণ্ঠস্বরের জায়গায়। সমকালীন নথিতে বিদ্রোহীদের নিজেদের বক্তব্য সব সময় সরাসরি পাওয়া যায় না। গবেষণা প্রকল্পটি জন বলের নামে প্রচলিত কয়েকটি চিঠি নিয়েও সতর্ক করেছে—ইতিহাসলেখকেরা বিদ্রোহকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে সেগুলি ব্যবহার করে থাকতে পারেন। ফলে অতীতের মানুষের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া আর তাঁদের হয়ে নতুন কণ্ঠ তৈরি করা এক বিষয় নয়।
বিশ্লেষণ: এখানেই ঐতিহাসিক উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। ইতিহাস জানাতে পারে কে কোথায় গিয়েছিলেন, কী দাবি উঠেছিল, কার মৃত্যু হয়েছিল, কী শাস্তি এসেছিল। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ সেই মুহূর্তে ভয় পেয়েছিলেন কি না, রাগ করেছিলেন কি না, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছিলেন—তার সম্পূর্ণ উত্তর নথিতে থাকে না। সেই ফাঁকেই ঢোকে কল্পনা।
তবে কল্পনা আর ইতিহাসের সীমারেখা মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই। একটি চরিত্র সাহিত্যিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে, অথচ তার প্রতিটি অনুভূতি ঐতিহাসিক নথিতে প্রমাণিত নয়। বরং এই দুই সত্যকে পাশাপাশি রাখাই ঐতিহাসিক উপন্যাসের পাঠকে আরও সমৃদ্ধ করে।
‘ডুম পেইন্টিং’ তাই শুধু ১৩৮১ সালের আরেকটি বিদ্রোহের গল্প নয়। রাজা ও অভিজাতদের পরিচিত ইতিহাসের নিচে থাকা মানুষরা কী চেয়েছিল, কেন রাস্তায় নেমেছিল এবং কীভাবে তাদের দাবি ক্ষমতার দরজায় পৌঁছেছিল—সেই প্রশ্নকে ৬৭২ পৃষ্ঠার কাহিনির কেন্দ্রে আনছে ব্লেকমোর। বইটির ভাষা বা চরিত্রায়ণ নিয়ে পাঠকের মত আলাদা হতে পারে। কিন্তু ১৬ দিনের এক বিদ্রোহকে দীর্ঘ উপন্যাসের কেন্দ্রে বসিয়ে ইতিহাসের আলোটা রাজদরবার থেকে সরিয়ে জনতার দিকে ঘোরানোই এই বইয়ের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



