অন্ধকারেরও দাম আছে

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন বিদ্যুৎ না থাকা কোনও বিমূর্ত উন্নয়ন-সূচক নয়।
- রাতের খাবার, পড়াশোনা, রাস্তায় হাঁটা থেকে নিরাপত্তা—জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তেই তার ছাপ পড়ে।
- নেলসন মাকেঙ্গোর তথ্যচিত্র ‘রাইজিং আপ অ্যাট নাইট’ ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রু স্টোরি অনলাইন সেবায় মুক্তি পাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন
বিদ্যুৎ না থাকা কোনও বিমূর্ত উন্নয়ন-সূচক নয়। রাতের খাবার, পড়াশোনা, রাস্তায় হাঁটা থেকে নিরাপত্তা—জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তেই তার ছাপ পড়ে। নেলসন মাকেঙ্গোর তথ্যচিত্র ‘রাইজিং আপ অ্যাট নাইট’ ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রু স্টোরি অনলাইন সেবায় মুক্তি পাচ্ছে। ছবিটির মূল লিঙ্গালা নাম ‘টোঙ্গো সা’। ৯৬ মিনিটের এই বেলজিয়াম–কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র–জার্মানি–বুরকিনা ফাসো–কাতার যৌথ প্রযোজনা মাকেঙ্গোর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র। নিজের শহর কিনশাসার কিসেনসো মহল্লাতেই তিনি অনুসরণ করেছেন দীর্ঘ বিদ্যুৎ-সংকট, বন্যা এবং আলো ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা।
ছবিটি অবশ্য নতুন তৈরি নয়। ২০২৪ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের প্যানোরামা বিভাগে প্রথম প্রদর্শনের পর সিয়াটল, নিউ ইয়র্ক আফ্রিকান চলচ্চিত্র উৎসব-সহ একাধিক আয়োজনে দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালের নতুন ঘটনা হল এর অনলাইন মুক্তি—যা উৎসবের সীমিত দর্শকের বাইরে ছবিটিকে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। এই তারিখের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো দৃশ্যকে ২৫ সেপ্টেম্বরের কিনশাসার বিদ্যুৎ-পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিবেদন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের নিবিড় নথি, বর্তমানের বিদ্যুৎ-পরিষেবার হালনাগাদ মানচিত্র নয়।
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন কুদি। মহল্লার মানুষের কাছ থেকে অর্থ তুলে কাটা বা চুরি যাওয়া তার কিনে বিদ্যুৎ ফেরানোর চেষ্টা করেন তিনি। তহবিল সংগ্রহে বাড়ি বাড়ি যান বহু নারীও। অন্যদিকে, বন্যায় ঘর হারানো দাভিদোকে লড়তে হয় আশ্রয়ের জন্য। গির্জায় প্রার্থনাপুস্তক পড়তে কেউ আলো-জ্বলা ছোট মেডেলের সাহায্য নেন; রাতের খাবার চলে মোমের আলোয়। বছরের শেষের উৎসবে কুদি আবার সান্তা ক্লজের পোশাকও পরেন। এই ঘটনাগুলি উৎসব-সংস্থার প্রকাশিত কাহিনিবিবরণে রয়েছে; নতুন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি তথ্য নয়।
পটভূমিতে রয়েছে বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। অথচ শহরের মানুষের অপেক্ষা ফুরোয় না। এই বৈপরীত্য ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলেও, জাতীয় বিদ্যুৎনীতি বা পরিকাঠামোর পূর্ণ চিত্র পেতে সরকারি প্রকল্পের তথ্য, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা, খরচ এবং স্থানীয় সংযোগের আলাদা নথি প্রয়োজন। তথ্যচিত্রটি কয়েকজন মানুষের জীবন অনুসরণ করে; কিনশাসার প্রতিটি মহল্লা বা শহরের কোটি কোটি মানুষের অভিজ্ঞতাকে একই গল্পে মেলানো যায় না।
বিশ্লেষণ
‘রাইজিং আপ অ্যাট নাইট’-এর মতো ছবিকে দেখে ‘সহনশীলতা’ শব্দটি খুব সহজেই সামনে আসে। কিন্তু মোম জ্বালিয়ে, অর্থ তুলে, নিজেদের উদ্যোগে তার মেরামত করে মানুষ টিকে আছেন—এটি তাঁদের সক্ষমতা, ব্যর্থ পরিষেবার অজুহাত নয়। সম্প্রদায়ের উদ্যোগকে অতিরিক্ত রোমান্টিক করে দেখালে রাষ্ট্র, বিদ্যুৎ সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের দায়িত্ব আড়ালে চলে যেতে পারে। আলো ফেরাতে বাসিন্দাদের যদি অনিরাপদ বা সন্দেহজনক উৎস থেকে তার কিনতে হয়, তবে সমস্যার সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
মাকেঙ্গোর রাত তাই শুধু সুন্দর অন্ধকার নয়। শব্দ, প্রার্থনা, মোমের ক্ষীণ আলো—সব মিলিয়ে এমন এক শহরের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, যেখানে দৃশ্যমানতার অভাবই দৈনন্দিন জীবনের বড় বাস্তবতা। অনলাইন মুক্তি সেই অভিজ্ঞতা আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু দর্শকের সহানুভূতি আর বাস্তব পরিষেবার পরিবর্তন এক জিনিস নয়। ছবিটির গুরুত্ব বরং সেখানে, যেখানে ‘অন্ধকারেও মানুষ হাসে’ ধরনের সহজ গল্পের বাইরে গিয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকে মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সমান শহুরে অধিকারের অংশ হিসেবে দেখা যায়।
ছবিটির আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও উৎসবযাত্রাও সেই আলোচনার বাইরে নয়। পাঁচ দেশের সহ-প্রযোজনা নির্মাণ, সম্পাদনা ও আন্তর্জাতিক পরিবেশনের সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে—পর্দায় যাঁদের জীবন এসেছে, তাঁরা ছবির সাফল্য থেকে কীভাবে উপকৃত হন? তাঁদের সম্মতি, প্রদর্শনী থেকে আয় ভাগ বা নিজেদের মহল্লায় ছবিটি দেখার সুযোগ সম্পর্কে প্রকাশ্য উৎসে পূর্ণ তথ্য নেই। এই অনুপস্থিতিকে অনৈতিকতার প্রমাণ বলা যাবে না। তবে তথ্যচিত্রের ন্যায়সঙ্গত নির্মাণ বিচার করতে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিনশাসার মানুষের জীবন যখন আন্তর্জাতিক দর্শকের শিল্প-অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, তখন তাঁদের কণ্ঠ শুধু ছবির বিষয় হয়ে না থেকে প্রদর্শনের অংশীদারও হওয়া উচিত।
ছবির ভাষা লিঙ্গালা। আন্তর্জাতিক দর্শক তাই মূলত উপশিরোনামের উপর নির্ভর করবেন। অনুবাদের সময় ধর্মীয় ভাষা, স্থানীয় রসিকতা কিংবা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কথ্য শব্দের সূক্ষ্মতা সংস্করণভেদে বদলে যেতে পারে। ভালো উপশিরোনাম শুধু বক্তব্যের অর্থ পৌঁছে দেয় না, মানুষের কণ্ঠের স্বর ও পার্থক্যও যতটা সম্ভব ধরে রাখে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী দর্শকের ক্ষেত্রেও পরিবেশের শব্দ, প্রার্থনা কিংবা অন্ধকারে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির সংকেত লিখিতভাবে তুলে ধরা জরুরি। একই সঙ্গে, যে মহল্লার জীবন থেকে ছবিটি তৈরি, সেখানকার মানুষের জন্য স্থানীয় ভাষায় সহজলভ্য প্রদর্শনের সুযোগও আন্তর্জাতিক উৎসবের দর্শকের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে আলো পেলেন, কে পেলেন না—এতটুকু নয়। প্রশ্ন হল, আলো পাওয়ার অধিকারটি কেন এত অনিশ্চিত। ‘রাইজিং আপ অ্যাট নাইট’ সেই প্রশ্নটিকেই অন্ধকারের মধ্যে দৃশ্যমান করে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



