নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতভেদ প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধীদের আক্রমণের মুখে পাল্টা সরব হল বিজেপি। দলের দাবি, কমিশনারদের মধ্যে ভিন্নমত আসলে সজীব গণতন্ত্রের লক্ষণ। নির্বাচনী পরাজয়ের দায় এড়াতে কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করার অভিযান চালাচ্ছে। বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরে ঐকমত্যে পৌঁছনোই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।

গত দশ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক নির্দেশ তাঁদের অগোচরে জারি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই খবর ঘিরেই কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।

পাত্রের পাল্টা যুক্তি, তিন কমিশনার কোনও আলোচনা না করে সব বিষয়ে সায় দিয়ে গেলে বিরোধীরাই একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ তুলতেন। অথচ তাঁদের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও মতবিনিময়ের খবর প্রকাশ পাওয়ার পর সেটিকেই বিরোধীরা আক্রমণের অস্ত্র করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পৃথক মত জানানো, উদ্বেগ নথিভুক্ত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মধ্যেই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত। কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে তাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না বলে দাবি করেন তিনি। বিজেপির মতে, মতভেদ থাকা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে একমত হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। আলোচনার পরিসর রয়েছে বলেই কমিশনাররা নিজেদের বক্তব্য লিখিতভাবে জানাতে পেরেছেন, এমন যুক্তিও সামনে আনেন পাত্র।

কমিশনের প্রকাশিত বিবৃতির উল্লেখ করে বিজেপি মুখপাত্র বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছিল সর্বসম্মতিক্রমে। কমিশনও জানিয়েছে, লিখিত মতামত, পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ তাদের স্বাভাবিক কাজের অঙ্গ। গত এক বছরে এসআইআর-সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। কেবল কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথি তুলে ধরলে সামগ্রিক ছবিটি পাওয়া যায় না বলেও কমিশনের বক্তব্য।

কংগ্রেসকে নিশানা করে পাত্র অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধীরা বারবার মানুষের সমর্থন হারিয়েছে। নির্বাচনে জিততে না পেরে তারা এখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে চাইছে। এ দিনের সাংবাদিক বৈঠক কমিশনের হয়ে করা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি; তাঁর বক্তব্য, কমিশনের নিজের বিবৃতির ভিত্তিতেই বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দিচ্ছেন।

এরপর প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ এবং অবসরের পরে তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গ তোলেন পাত্র। তিনি স্মরণ করান, প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়েছিলেন। আর এক প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এম এস গিল পরে কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নবীন চাওলার নিয়োগ নিয়েও আক্রমণ শানান পাত্র। তাঁর অভিযোগ, ২০০৫ সালে চাওলার নিয়োগে সনিয়া গান্ধীর ভূমিকা ছিল। কোন সরকারি পদে থেকে সনিয়া সেই প্রভাব খাটিয়েছিলেন, প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাত্র আরও বলেন, ২০০৯ সালে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এন গোপালস্বামী রাষ্ট্রপতির কাছে চাওলাকে সরানোর সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে সরানোর পরিবর্তে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের ফলও নিজের যুক্তির সমর্থনে তুলে ধরেন পাত্র। তাঁর উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়া ২০টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে তৃণমূল জিতেছে ১৩টিতে, কংগ্রেস একটিতে এবং বিজেপি ছয়টিতে। ভোটার বাদ পড়াই পরাজয়ের কারণ, মানতে নারাজ তিনি।

জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করতেই বিজেপি মাঠে নেমেছে, বিরোধীদের এই অভিযোগও খারিজ করেন পাত্র। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার বহু আগে থেকেই বিজেপি বড় ব্যবধানে নির্বাচনে জিতছে। কোনও ব্যক্তিকে বাঁচানো নয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জবাব দেওয়া এবং গণতন্ত্র রক্ষা করাই দলের উদ্দেশ্য বলে দাবি করেন তিনি।