‘ফিরব’, ডিসেম্বরেই

যা জানা জরুরি
- নিজের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
- তবে ঢাকায় ফেরার পথে কারাবাস বা অন্য কোনও আইনি পরিণতি এলেও তিনি পিছিয়ে যাবেন না বলে জানিয়েছেন।
- তাঁর বক্তব্য, প্রশ্নটা আর তিনি ফিরবেন কি না—তা নয়; বরং কী ভাবে ফিরবেন, সেটাই এখন আসল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ঢাকায় ফেরার পথে কারাবাস বা অন্য কোনও আইনি পরিণতি এলেও তিনি পিছিয়ে যাবেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রশ্নটা আর তিনি ফিরবেন কি না—তা নয়; বরং কী ভাবে ফিরবেন, সেটাই এখন আসল।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে হাসিনা বলেন, “এই বিচারপ্রক্রিয়া এবং তার রায় আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রত্যাখ্যান করছি।” একই সঙ্গে জানান, রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের মানুষের সেবা করার জন্য প্রয়োজন হলে কারাবাস-সহ যে কোনও আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে তিনি প্রস্তুত। তাঁর কথায়, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিকদের কল্যাণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার অটুট এবং ভয় দেখিয়ে তাঁকে দেশের প্রতি কর্তব্য থেকে সরানো যাবে না।
কেন তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন হাসিনা। তাঁর দাবি, দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন—এমন প্রচার করে তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, তা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
হাসিনার কথায়, “আমি আমার মাতৃভূমিতে, আমার মানুষের কাছে ফিরে যেতে চাই। প্রশ্নটা আমি ফিরব কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, আমাদের দেশ ও তার নাগরিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে কী ভাবে ফিরব।”
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত মাসে নিজের প্রথম সাংবাদিক বৈঠকেও একই সুরে কথা বলেছিলেন হাসিনা। বলেছিলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাবনিকাশের গণ্ডি তাঁর জীবন বহু আগেই পেরিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে ভারত বা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কোনও গোপন কিংবা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নেরও মুখোমুখি হন তিনি। প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করা হাসিনার উত্তর, “আমার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা চলছে, জল্পনাও প্রচুর।”
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাক্তন প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছিলেন, হাসিনা সরকারের পতনের সময়কার বিক্ষোভে প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
গত ৫ অগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে অনলাইনে যোগ দিয়েছিলেন হাসিনা। সেখানেই তাঁকে ঢাকায় ফেরার সময় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে হাসিনা বলেন, “ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। তাই আমি ডিসেম্বর মাসেই ফিরতে চাই।”
তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক পথ এখন সহজ নয়। বাংলাদেশে তাঁর দল আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ। একই সময়ে দেশে সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির সম্ভাব্য বাড়বাড়ন্ত নিয়ে যে সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সে প্রসঙ্গেও সতর্ক করেছেন হাসিনা।
তাঁর কথায়, “বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির বিপদ অত্যন্ত গুরুতর। একে কখনও খাটো করে দেখা উচিত নয়।”
হাসিনার মতে, এই ধরনের গোষ্ঠীর জাল ও মতাদর্শ কোনও একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। সীমান্ত পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সমস্যা মোকাবিলা করা বাস্তবসম্মত নয় বলেই তাঁর মত। বরং এর আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক—দুই মাত্রাই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আওয়ামি লিগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দলকে ফের সক্রিয় করার কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন হাসিনা। তাঁর দাবি, সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং দেশজুড়ে সমর্থকদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ তৈরির প্রক্রিয়ায় তিনি নিজেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন।
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নও। হাসিনার কথায়, তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার যাতে সংরক্ষিত হয় এবং যথাযথ সম্মান পায়, সেটিও তাঁর লক্ষ্য।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক মতামতমূলক নিবন্ধে হাসিনা আওয়ামি লিগকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, দলটি কোনও শাসকের খেয়ালখুশি, বিদেশি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা বা ক্ষমতার লালসা থেকে তৈরি হয়নি। তাঁর দাবি, আওয়ামি লিগ বাংলার মাটি, মানুষ, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক আবেগ।
ফলে ডিসেম্বরের দিকে নজর এখন শুধু হাসিনার নয়। তাঁর ঘোষিত প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের ভবিষ্যৎ এবং দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক—সব কিছুরই নতুন সমীকরণ জড়িয়ে যাচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



