মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সরাতে হবে, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে এবং স্থগিত রাখতে হবে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তি নিয়ে অনুসন্ধান প্রকাশিত হওয়ার পরে এই তিন দাবিতে সরব হল বিরোধী শিবির। বুধবার বিভিন্ন দলের সাংবাদিক বৈঠকে আক্রমণের কেন্দ্রে ছিলেন জ্ঞানেশ।

নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে তাঁদের অজ্ঞাতে। আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে নতুন ভোটারের নাম তোলার আবেদনপত্রে পরিবর্তন, নাম বাদ দেওয়া ও ফেরানো, এবং ভোটার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত করা।

দুই কমিশনারের উদ্বেগ ছিল ভোটার তালিকা পরিচালনার ব্যবস্থাতেও। স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকেরা তথ্যভাণ্ডারে প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন কি না, উঠেছিল সেই প্রশ্ন। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তাঁরা ক্যাবিনেট সচিবকেও চিঠি লেখেন। নতুন ভোটারের আবেদনপত্র ফর্ম ৬ বদলানোর ক্ষেত্রে তাঁদের লিখিত মত অগ্রাহ্য করার অভিযোগও রয়েছে। এই নথিগুলিই বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিগুলির অনুলিপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকেও দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংবাদপত্রটি।

এবার বিরোধীদের অবস্থানে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গোটা কমিশনকে একযোগে দায়ী করার বদলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকাকে আলাদা করে চিহ্নিত করছে তারা। কংগ্রেসের কে সি বেণুগোপাল আদালতের নজরদারিতে তদন্ত চান। পি চিদম্বরমের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত সংসদীয় কমিটি খতিয়ে দেখুক।

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, ভোট চুরি দেশবাসীর বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সংবিধানের উপরে সরাসরি আঘাত। বিজেপি, আরএসএস ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ নিজের সহকর্মীদের মতও অগ্রাহ্য করে কমিশন চালাচ্ছেন। সব আপত্তিপত্র প্রকাশের দাবি জানান তিনি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছেন, যার ফল দেশের মানুষের সামনে রাখতে হবে।

বুধবার পৃথক সাংবাদিক বৈঠকে সিঙ্ঘভি স্মরণ করিয়ে দেন, কমিশনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অন্য দুই সদস্যের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর বক্তব্য, ১৯৯৫ সালেই সুপ্রিম কোর্ট কমিশনারদের সমমর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল। সেই প্রেক্ষিতে দুই সহকর্মীর মত উপেক্ষা করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কংগ্রেস সভাপতির অভিযোগও একই দিকে: বিরোধীদের প্রশ্ন এতদিন উড়িয়ে দেওয়া হলেও এবার আপত্তি উঠেছে প্রতিষ্ঠানের অন্দর থেকেই।

কলকাতায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশের অপসারণ ও আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত দাবি করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চান, বিশেষ সংশোধনের আগের ভোটার তালিকা ফিরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিধানসভা নির্বাচন হোক। লক্ষ্ণৌয়ে অখিলেশ যাদব সুপ্রিম কোর্টকে স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন। আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টিও; প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, তাঁদের মূল দল নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে দিল্লি যাচ্ছে।

আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরীওয়াল আরও এক ধাপ এগিয়ে জ্ঞানেশের গ্রেফতার ও বিচার চেয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা দিয়েছে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও হরিয়ানায় গত কয়েক বছরের নির্বাচন বাতিল করে ফের ভোট করার দাবি তুলেছেন তিনি। এগুলি বিরোধী নেতার অভিযোগ ও দাবি; আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।

বাম দলগুলিও জ্ঞানেশের অপসারণ চেয়েছে। সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে চিঠি লিখে জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রকাশিত তথ্য কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সততা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা অভিযোগ করেন, ভোটারদের বেছে নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। কমিশনের প্রতি আস্থা ফেরাতে জ্ঞানেশের সরে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনা উদ্ধব শিবিরের প্রধান উদ্ধব ঠাকরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ ও গ্রেফতার দাবি করেছেন। লিখিত আপত্তি নথিভুক্ত করায় সান্ধু ও জোশীকে ধন্যবাদও জানান তিনি। তাঁর দাবি, কমিশনের ভুল সিদ্ধান্ত বাতিল করে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে ব্যালটপত্রে নতুন নির্বাচন হোক। কমিশনের পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগগুলি তদন্ত করে দেখার কথাও বলেছেন উদ্ধব।

এনসিপি শরদ শিবিরের নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে বিষয়টিকে সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের ভিতরের লোকেরাই যখন অভিযোগ করছেন, তখন নাগরিকেরা কাকে বিশ্বাস করবেন? অবিলম্বে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার দাবি জানিয়েছেন তিনি। কমিশনকে আরও বেশি নৈতিক দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন সুলে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মতপার্থক্য ও লিখিত পর্যবেক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অঙ্গ। তাদের দাবি, গত এক বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে হয়েছে। তবে বিবৃতিতে ১৪টি নথির অস্তিত্ব, তারিখ বা বিষয়বস্তু অস্বীকার করা হয়নি। ফর্ম ৬ কে বদলালেন, পশ্চিমবঙ্গে নাম ফেরানোর বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি কে দিলেন, কিংবা মে থেকে আগস্ট পূর্ণাঙ্গ কমিশনের বৈঠক কেন হয়নি—এসবের নির্দিষ্ট জবাবও মেলেনি।

কমিশনের আরও যুক্তি, বহু সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের মধ্যে কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথি আলাদা করে দেখালে অসম্পূর্ণ ছবি তৈরি হয়। ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কঠোর নিরাপত্তাবিধির অধীন বলেও জানিয়েছে তারা। তবে দুই কমিশনারের উদ্বেগ কীভাবে মেটানো হয়েছে, বিবৃতিতে সেই ব্যাখ্যা নেই।

বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র পাল্টা বলেছেন, কমিশনের অভ্যন্তরে আলোচনা ও ভিন্নমত গণতন্ত্রের প্রাণবন্ততার লক্ষণ। বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। কমিশনের বিবৃতি উল্লেখ করে তাঁর দাবি, শেষ পর্যন্ত বিশেষ সংশোধনের সিদ্ধান্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই হয়েছিল। ফলে লিখিত আপত্তি প্রকাশ্যে আসার পরে বিরোধীদের দাবি এবং কমিশনের সর্বসম্মতির বক্তব্যের মধ্যেকার ব্যবধানই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়ে গেল।