পাঁচ পাখি থেকে ভোটজয়!

যা জানা জরুরি
- ভোট দিতে পারেনি প্রার্থী, প্রচারপত্রও বিলোয়নি।
- তবু ২১ সেপ্টেম্বর ঘোষিত নিউজিল্যান্ডের ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের কালো রবিন—মাওরি নামে কারুরে।
- আয়োজক ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ডের হিসাবে এ বার প্রায় ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ ভোট দিয়েছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোট দিতে পারেনি প্রার্থী, প্রচারপত্রও বিলোয়নি। তবু ২১ সেপ্টেম্বর ঘোষিত নিউজিল্যান্ডের ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের কালো রবিন—মাওরি নামে কারুরে। আয়োজক ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ডের হিসাবে এ বার প্রায় ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ ভোট দিয়েছেন। কারুরের ভোটসংখ্যা নিয়ে সংগঠনের একই বিজ্ঞপ্তিতে ২৫,৬১০ এবং ২৬,৬১০—দুই রকম সংখ্যা রয়েছে। তাই নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, ২৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে কাকাপো ও নিউজিল্যান্ড ফ্যালকনকে পিছনে ফেলেছে পাখিটি।
‘শাই বার্ডস’ বনাম ‘ট্রি বার্ডস’, প্রার্থীদের মিম, আর ক্ষতিকর প্রাণীদের নিয়ে ‘পেস্ট গ্যালারি’—হালকা মেজাজের এই নির্বাচনের মজার দিকের অভাব নেই। কিন্তু এ বারের বিজয়ীর ইতিহাস একেবারেই মজার নয়। বরং অবিশ্বাস্য।
পাঁচ থেকে ৩৫০
১৯৮০ সালে পৃথিবীতে পরিচিত কালো রবিন ছিল মাত্র পাঁচটি। তাদের মধ্যে ডিম পাড়তে সক্ষম একমাত্র স্ত্রী পাখিটির নাম ছিল ‘ওল্ড ব্লু’। তার সঙ্গী ‘ওল্ড ইয়েলো’। আজকের প্রায় ৩৫০টি প্রাপ্তবয়স্ক কালো রবিনের বংশগত ইতিহাস মূলত ওই জুটির কাছেই গিয়ে মেলে।
উনিশ শতক ও বিশ শতকের গোড়ায় মানুষের সঙ্গে দ্বীপে পৌঁছে যাওয়া বিড়াল ও ইঁদুর এবং বনভূমির পরিবর্তন এই পাখিটিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। ১৯৭৬ সালে বেঁচে থাকা পাখিগুলিকে খাড়া লিটল মাঙ্গেরে দ্বীপ থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মাঙ্গেরে দ্বীপে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর পর শুরু হয় একের পর এক সংরক্ষণ-পরীক্ষা। অন্য প্রজাতির পাখির বাসায় কালো রবিনের ডিম দিয়ে তা ফোটানো, ছানা পালনের ব্যবস্থা এবং পাখিটির নিজস্ব প্রজননহার বাড়ানোর কৌশল—সবই কাজে লাগানো হয়েছিল।
সেই মরিয়া প্রচেষ্টার ফলেই ধীরে ধীরে ফিরেছে কারুরে।
ফিরেছে, কিন্তু বিপদ কাটেনি
বর্তমানে কালো রবিন মাউঙ্গেরে–মাঙ্গেরে এবং হোকোরেরেওরো–রাঙ্গাতিরা—দুটি শিকারিমুক্ত প্রকৃতি সংরক্ষণ দ্বীপে বাস করে। সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় সংরক্ষণ তালিকায় এখনও তাদের অবস্থা ‘ন্যাশনালি ক্রিটিক্যাল’।
কারণ সংখ্যার পাশাপাশি জায়গার প্রশ্নও রয়েছে। ছোট দুটি দ্বীপের উপযুক্ত আবাসস্থল প্রায় পূর্ণ। ভালো অঞ্চলগুলির অধিকাংশই ইতিমধ্যে বসবাসকারী পাখিদের দখলে। তার উপর ঝড়, রোগ কিংবা কোনও নতুন শিকারি ঢুকে পড়লে অল্প সময়েই বড় সংখ্যক পাখি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তাই সংরক্ষণকর্মীরা পিট দ্বীপে তৃতীয় একটি জনসংখ্যা গড়ে তোলার কথা ভাবছেন। বর্তমান দুই আশ্রয়ের মাঝামাঝি এই দ্বীপে ইতিমধ্যেই পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। ফেরাল বিড়াল সরিয়ে নিম্নভূমির উপকূলীয় বন ফিরিয়ে আনা গেলে শুধু কালো রবিন নয়, চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের আরও বিপন্ন পাখিও উপকৃত হতে পারে।
এই দ্বীপমালায় নিউজিল্যান্ডের মোট হুমকিগ্রস্ত পাখির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের দেখা মেলে।
এ বার ভোটের ময়দানেও সংরক্ষণ
এ বারের নির্বাচনে ৮৮ শতাংশ ভোট এসেছে নিউজিল্যান্ডের ভিতর থেকে। শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রও বসানো হয়েছিল। পিট দ্বীপের স্কুলশিক্ষার্থীরা কারুরেকে নিয়ে ছবি এঁকেছে, কবিতা লিখেছে।
ফলে এই নির্বাচন শুধু অনলাইন জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা হয়ে থাকেনি। বিপন্ন একটি পাখির গল্প মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় সংরক্ষণে জনসমর্থন তৈরি করার মাধ্যমও হয়েছে।
তবে পাঁচ থেকে ৩৫০—এই উত্থান যতটা আনন্দের, তার ভিতরে ততটাই লুকিয়ে রয়েছে নতুন ঝুঁকি। জিনগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ, প্রজনন এবং বদলে যাওয়া পরিবেশে অভিযোজন নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়। একটি মাত্র উর্বর স্ত্রী পাখির বংশধরদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জনসংখ্যাকে তাই আরও নিরাপদ জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
পিট দ্বীপে নতুন জনসংখ্যা গড়ার আগে আবাসস্থল, খাদ্য, শিকারি নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ পর্যবেক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি ভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
পাখির নির্বাচন মজার—কারণ জিতেও কোনও মন্ত্রিসভা গঠন করতে হয় না। কিন্তু কারুরের জয়ের দাবি একেবারেই বাস্তব: আরও নিরাপদ বন, আরও একটু জায়গা।
মুকুট হয়তো এক বছরের। কিন্তু তৃতীয় একটি নিরাপদ জনসংখ্যা গড়ে উঠতে পারলে, সেটিই হবে কারুরের সবচেয়ে বড় ‘নির্বাচনী জয়’।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



