International

টাকার জন্য লম্বা লাইন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাহাত্তর বছরের অবসরপ্রাপ্ত ভিক্তর রদ্রিগেস ১৭ সেপ্টেম্বর ভোরেই বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হাভানার একটি ব্যাঙ্কের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
  • সকাল সাড়ে সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েও অবশ্য নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় ছিল না।
  • তাঁর পালা আসার আগেই ব্যাঙ্কের নোট ফুরিয়ে যেতে পারে, বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, এমনকি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে শাখার পরিষেবাও থেমে যেতে পারে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাহাত্তর বছরের অবসরপ্রাপ্ত ভিক্তর রদ্রিগেস ১৭ সেপ্টেম্বর ভোরেই বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হাভানার একটি ব্যাঙ্কের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সকাল সাড়ে সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েও অবশ্য নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় ছিল না। তাঁর পালা আসার আগেই ব্যাঙ্কের নোট ফুরিয়ে যেতে পারে, বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, এমনকি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে শাখার পরিষেবাও থেমে যেতে পারে।

সর্বোচ্চ দৈনিক ২০ হাজার পেসো—অনানুষ্ঠানিক বাজারের দরে প্রায় ২৮ ডলার—তোলার আশায় রদ্রিগেসের মতো বহু প্রবীণ রোদ ওঠার আগেই লাইনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক মাঠপ্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিউবার নগদ-সংকটের এই ছবি।

খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দীর্ঘদিনের ঘাটতির সঙ্গে কিউবার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে এ বার যোগ হয়েছে কাগুজে টাকার সংকটও। সেপ্টেম্বরে অনানুষ্ঠানিক বাজারে এক ডলারের দাম পৌঁছেছে প্রায় ৭০০ পেসোয়। ২০২১ সালের তুলনায় পেসোর মূল্য নেমে এসেছে প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে।

জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সরকারি ভোক্তামূল্য সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক বাজারের লেনদেন এই হিসাবের পুরোটা প্রতিফলিত না করায় বাস্তব মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বেশি হতে পারে।

বড় নোট, ছোট স্বস্তি

সরকার সেপ্টেম্বরে ১০ হাজার ও ২০ হাজার পেসোর নতুন নোট বাজারে এনেছে। এর আগে এপ্রিলে চালু হয়েছিল ২ হাজার ও ৫ হাজার পেসোর নোট।

উচ্চ মূল্যমানের নোটে অবশ্য একটি সমস্যা মেটে—বড় অঙ্কের কেনাকাটায় কম কাগজ বহন করতে হয়। কিন্তু নোটের অঙ্ক বড় হলেই মূল্যস্ফীতি কমে না। বরং এমন নোটের প্রয়োজনীয়তাই দেখিয়ে দেয়, আগের সবচেয়ে বড় নোট দিয়ে দৈনন্দিন লেনদেন কতটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে। সরকার প্রথম বেসরকারি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়কেন্দ্রকে অনুমতি দিয়েছে। এত দিন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করত। নতুন ব্যবস্থা বাজারের বাস্তব দর সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এবং অনানুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রা কারবারের কিছু অংশ আইনি পথে আনতে পারে—এমনই আশা সরকারের।

তবে বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। নগদ ডলার কতটা পাওয়া যাবে? বিনিময় হার কী ভাবে নির্ধারিত হবে? সাধারণ মানুষ আদৌ কতটা এই ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন? উত্তর মিলবে ব্যবস্থাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখা গেলে।

শুধু নিষেধাজ্ঞার গল্প নয়

রাষ্ট্রপতি মিগেল দিয়াস-কানেল বলেছেন, সরকার সমাজতন্ত্রের পথ ছাড়ছে না; বরং আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং জ্বালানি-সংকটের মধ্যে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা কিউবার আমদানি, অর্থপ্রবাহ ও তেল সরবরাহে বড় বাধা তৈরি করেছে। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে শুধু নিষেধাজ্ঞাকেই দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ২০২১ সালের মুদ্রা-সংস্কারের সমস্যা, কম উৎপাদন, পর্যটন-আয়ে ধাক্কা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সংকটের অংশ।

হাভানার বাজারে এখন অনেক পণ্য আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে। কিন্তু সেগুলির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বাসিন্দা ইউসেত রদ্রিগেসের হিসাবটা সহজ—খাবার কিনলে পোশাক বাদ, পোশাক কিনলে বাইরে যাওয়া বাদ।

মিডিয়ালা হন মেসার পর্যবেক্ষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে: বাজারে খাবার রয়েছে, কিন্তু স্থির আয় দিয়ে সেই খাবার কেনার ক্ষমতা নেই।

পণ্য আছে, ক্রয়ক্ষমতা কোথায়?

এখানেই কিউবার সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বাজারে পণ্য থাকা আর মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা থাকা এক কথা নয়। একই ভাবে, বেসরকারি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়কেন্দ্র চালু করলেই মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল হয়ে যায় না।

সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক বিনিময় হারের বিশাল ব্যবধান, নিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাট এবং ব্যাঙ্কে নগদের অভাব থাকলে বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন।

সংস্কারের সাফল্য তাই নতুন নোটের ছবিতে নয়, বরং রদ্রিগেসের মতো মানুষকে পরের সপ্তাহেও ভোরে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে কি না, তার মধ্যে ধরা পড়বে।

পেসোর ক্রয়ক্ষমতা স্থির হচ্ছে কি না, বেতন ও পেনশনের সঙ্গে বাজারদামের ব্যবধান কমছে কি না—সেই হিসাবই শেষ পর্যন্ত বড়।

হাভানার লাইনে আপাতত সময়ও এক ধরনের মুদ্রা। যার শরীর, যাতায়াতের সামর্থ্য বা কাজ থেকে ছুটি নেই, তার কাছে নিজের টাকা তোলার দামও যেন একটু বেশি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles