ন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে প্রার্থী-কর্মীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ; ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষার মুখে বিজেপি

কোথাও প্রার্থী সরে দাঁড়াচ্ছেন, কোথাও বিরোধী প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আবার কোথাও পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলে মাঠে নেমে প্রচার থেকেই বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বিরোধী নেতা। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে একের পর এক এমন ঘটনায় উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, তাঁদের প্রার্থী ও কর্মীদের উপরে পরিকল্পিত ভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

বিধানসভা ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার পরে এই দুই উপনির্বাচনই বিজেপির প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। অন্য দিকে, গ্রেফতার এবং ভয় দেখানোর অভিযোগের আবহে বিপর্যস্ত বিরোধী শিবিরকে নিয়ে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিরোধীদের কটাক্ষ করলেও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতার সুর শোনা গিয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের গলায়। তিনি বলেন, “তথাকথিত প্রধান বিরোধী দলটির কোনও নাম নেই… তাদের নন্দীগ্রামের প্রার্থী কয়েকশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এলেন, অথচ দল কিছুই জানল না। এ থেকেই প্রমাণ হয়, বিরোধী বলে কেউ নেই। গণতন্ত্রে এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।”

নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল গোষ্ঠীর প্রার্থী সঞ্চিতা দে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। তার পরে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন জানান মমতা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মামলায় গ্রেফতার হন মিলন।

শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে ভবানীপুর আসনটি রাখায় এই উপনির্বাচন হচ্ছে। ভবানীপুরে তিনি মমতাকে হারিয়েছিলেন।

মমতা-শিবিরের মুখপাত্র প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বিরোধী কণ্ঠরোধ করার এই ঘটনা বিজেপির “ফ্যাসিবাদী প্রবণতা”র পরিচায়ক। তাঁর বক্তব্য, “ওরা মানুষের রায় পেয়েছে। কিন্তু এখন বিরোধীদের দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করছে।”

রেজিনগরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীরও দলীয় কর্মীদের পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আর মাঠে নেমে প্রচার করবেন না। এই কেন্দ্রে তাঁর দলের প্রার্থী ছেলে গোলাম নবি আজাদ।

সোমবার বহরমপুর থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার পরে কবীর জানান, আপাতত সমাজমাধ্যমেই প্রচার চালাবেন। তাঁর কথায়, “বিষয়টা একেবারে স্পষ্ট। পুলিশ আমাকে এবং আমার দলের কর্মীদের হয়রান করার চেষ্টা করছে। কর্মীদের আরও গ্রেফতার ও হয়রানি থেকে বাঁচাতে ঠিক করেছি, মাঠে নেমে প্রচার করব না। আমার ছেলে, যে প্রার্থী হয়েছে, তাকেও প্রচারে নামতে দেব না। তার বদলে সমাজমাধ্যম ব্যবহার করব। কিন্তু মাথা নোয়াব না।”

কবীর নওদা আসনটি রেখে রেজিনগরের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন হচ্ছে। তৃণমূলের এই প্রাক্তন বিধায়ক বিধানসভা নির্বাচনের আগে দল ছেড়ে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি গড়েন। মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি।

কবীরকে পুলিশের তলবের সূত্র একটি ছড়িয়ে পড়া অডিয়ো রেকর্ডিং। অভিযোগ, সেখানে দু’জনকে মুর্শিদাবাদে নির্মীয়মাণ ওই মসজিদের আশপাশের নজরদারি ক্যামেরা বন্ধ করে বিজেপির পতাকা লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে শোনা গিয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করা।

পুলিশের দাবি, রেকর্ডিংয়ের একটি কণ্ঠস্বর সরফরাজ নওয়াজ চৌধুরীর। নওদার টুঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা সরফরাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, অন্য কণ্ঠস্বরটি মুর্শিদাবাদের এক রাজনৈতিক নেতার। সরফরাজকে জেরা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কবীরকে নোটিস পাঠায় পুলিশ।

গত কয়েক দিনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি তৎপরতা বেড়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন পুরনো মামলায় দলের চার শীর্ষ পদাধিকারী—মনজুর রহমান, নাসিম শেখ, হক মল্লিক ও আব্দুল হালিমকে গ্রেফতার করা হয়।

তার আগের দিন, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ সালের নির্বাচনী সংঘর্ষের একটি মামলায় গ্রেফতার হন নির্দল প্রার্থী সাইফুল ইসলাম। তারও এক দিন আগে জাল নোট রাখার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় আম জনতা উন্নয়ন পার্টির রাজ্য সম্পাদক আশিক ইকবালকে।

কবীরের অভিযোগ, তাঁর দলের কর্মীদের নিশানা করতে বিজেপি এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের ভাঙা গোষ্ঠী ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস একযোগে কাজ করছে। তারাই স্থানীয় পুলিশের কাছে কর্মীদের নামের তালিকা দিচ্ছে বলে দাবি তাঁর।

রেজিনগরে তৃণমূলের অন্দরেও প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। দলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। কারণ হিসেবে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং নতুন নির্বাচনী প্রতীক ‘ফুটবলার’ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। পরে মমতা ও দলীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত বদলান রবিউল। এখন তিনি আবার লড়াইয়ে রয়েছেন।

এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি। বিজেপি প্রার্থী করেছে শাখারভ সরকারকে। রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষকে রেজিনগরে দলের নির্বাচনী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শাখারভের দাবি, তাঁদের প্রচারের মূল বিষয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, “আমি প্রচার করছি। এলাকায় ভাল শিল্প ও কারখানা গড়ে তোলার কথা বলছি। এখানে একটি কলেজ দরকার। উপযুক্ত সেতু দরকার। মানুষের কাছে আমাদের বক্তব্য উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে। যাঁরা আমাদের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা ধর্মকে হাতিয়ার করছেন।”

কবীরের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন গৌরীশঙ্করও। তাঁর বক্তব্য, “উনি জানেন, হেরে যাবেন। তাই এখন এ সব অজুহাত দিচ্ছেন। রেজিনগরে বিজেপিই জিতবে।”

রেজিনগরের প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোটার মুসলিম। ফলে এই কেন্দ্রের লড়াই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শুভেন্দু এই নির্বাচনকে সংখ্যালঘু ভোটারেরা সরকারের উন্নয়নের কর্মসূচিকে সমর্থন করতে চান কি না, তার “পরীক্ষা” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর সেই মন্তব্যের সমালোচনা করেছে বিরোধী শিবির। দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ফল ঘোষণা হবে ৯ অক্টোবর।