ধোঁয়ার দেশে অক্সিজেনের ফেরিওয়ালা

যা জানা জরুরি
- পশ্চিম কালিমানতানের স্কুলশিক্ষক এলি মারলিনা এখন জানালা খোলার আগে আকাশ দেখেন না, বাতাসের গন্ধ নেন।
- দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও পোড়া পিটমাটির ধোঁয়া ঢুকে পড়ে ঘরে।
- অথচ দিনের বেলায় সেই ধোঁয়ার উৎসের দিকেই ছুটতে হয় মারলিনাকে—কারণ তিনি একই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিম কালিমানতানের স্কুলশিক্ষক এলি মারলিনা এখন জানালা খোলার আগে আকাশ দেখেন না, বাতাসের গন্ধ নেন। দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও পোড়া পিটমাটির ধোঁয়া ঢুকে পড়ে ঘরে। রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অথচ দিনের বেলায় সেই ধোঁয়ার উৎসের দিকেই ছুটতে হয় মারলিনাকে—কারণ তিনি একই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক।
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা, কালিমানতান ও পাপুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় মাসের পর মাস ধরে বন ও জমিতে আগুন জ্বলছে। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত মাঠপ্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২ লক্ষ ২ হাজার হেক্টর জমি পুড়েছিল। অন্য দিকে স্বাধীন উপগ্রহ-তথ্য বিশ্লেষণে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ক্ষতি ধরে মোট পোড়া এলাকা প্রায় ৮ লক্ষ ৯৫ হাজার হেক্টর বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে আলাদা সময়সীমা ও পদ্ধতিতে তৈরি হওয়ায় এই দুই পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।
মাটির নীচেও আগুন
সবচেয়ে বিপজ্জনক আগুন পিটভূমিতে। জলাভূমির জৈবসমৃদ্ধ মাটি নিষ্কাশন করে শুকিয়ে ফেললে আগুন উপরিভাগে নিভে গেলেও মাটির নীচে জ্বলতে থাকে। কয়েক দিন পর অন্য জায়গায় ফের ধোঁয়া উঠতে শুরু করে। তেলপাম বা অন্য চাষের জন্য কম খরচে জমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে।
চলতি বছরের প্রবল এল নিনো খরা ও তাপমাত্রা বাড়িয়ে আগুনের পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে। কিন্তু আগুন লাগার ক্ষেত্রে আবহাওয়া আর মানুষের ভূমিকা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যই দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশে আগুন-সম্পর্কিত শ্বাসকষ্টের নথিভুক্ত ঘটনা ৫০,৮৯১ থেকে বেড়ে ১,১৩,৩৩৬ হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর মধ্য কালিমানতানের সাম্পিতে বায়ুমান সূচক পৌঁছেছিল ১,১৪২-এ। যেখানে ৩০০-এর উপরের মাত্রাকেই বিপজ্জনক ধরা হয়।
শুধু স্থানীয় মানুষের ফুসফুসেই আটকে থাকেনি এই ধোঁয়া। ইউরোপীয় কোপার্নিকাস ব্যবস্থার হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার আগুন থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড-সমতুল্য গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯৭ লক্ষ টন। ধোঁয়া পৌঁছে গিয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই ও ফিলিপাইনেও।
আগুন নেভাতে নামল রাষ্ট্র
পরিস্থিতি সামলাতে ৫০টিরও বেশি উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার, সেনাবাহিনী, কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা এবং বিদেশি সহায়তা কাজে লাগানো হচ্ছে। পুলিশ শতাধিক মানুষকে আটক করেছে এবং একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
তবে আটক বা তদন্ত মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। কোন আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, জমি ব্যবহারের অনুমোদনের শর্ত ভাঙা হয়েছিল কি না, কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানের নির্দেশে আগুন লাগানো হয়েছিল কি না—এসবের উত্তর দিতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে।
ধোঁয়ার মধ্যে স্থানীয় ভরসা
এই দীর্ঘ সংকটে স্থানীয় উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারী অগ্নিনির্বাপকদের ‘পাওয়ার অব মামা’ দল গ্রামে নজরদারি চালাচ্ছে, আগুন না-জ্বালানোর বিষয়ে মানুষকে সচেতন করছে এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
‘অক্সিজেন হাউস’-এর কর্মীরা বাড়ি বাড়ি অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া অক্সিজেন দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণ মোকাবিলার বিকল্প নয়। তা কেবল জরুরি মুহূর্তে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
এল নিনো একা দায়ী নয়
শুধু এল নিনোকে দায়ী করলে কয়েক দশকের বন উজাড়, পিটভূমি শুকিয়ে দেওয়া এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের ইতিহাস আড়ালে চলে যায়। আবার প্রতিটি ছোট কৃষককে একই ভাবে দায়ী করলেও শিল্পের জমির চাহিদা এবং বিকল্প জীবিকার অভাবের মতো বিষয়গুলি বাদ পড়ে।
নভেম্বরের বৃষ্টি আগুন কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার আগে পিটভূমিতে জল ফেরানো, জমির মালিকানা ও ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না হলে ধোঁয়া হয়তো শুধু কিছু দিনের জন্য থামবে।
কালিমানতানের পরিবারগুলির কাছে বিশুদ্ধ বাতাস এখন আর স্বাভাবিক কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—প্রয়োজনে দরজায় পৌঁছে দিতে হচ্ছে সেটিও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



