সংস্কৃতি ও বিনোদন

রক্ত নয়, বন্ধন!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • একজনের জন্ম ভারতের মাটিতে, অন্যজন এসেছে আফ্রিকার বটসোয়ানা থেকে।
  • তবু আজ তারা খাবার ভাগ করে খায়, পরস্পরের গা চেটে দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়।
  • মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে দুই পুরুষ চিতার এই বন্ধুত্ব চিতা পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্পের চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে এনে দিয়েছে এক অন্য রকম আশার আলো।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

একজনের জন্ম ভারতের মাটিতে, অন্যজন এসেছে আফ্রিকার বটসোয়ানা থেকে। একই মায়ের সন্তান নয়, একসঙ্গে বড়ও হয়নি। তবু আজ তারা খাবার ভাগ করে খায়, পরস্পরের গা চেটে দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে দুই পুরুষ চিতার এই বন্ধুত্ব চিতা পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্পের চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে এনে দিয়েছে এক অন্য রকম আশার আলো।

বনকর্মীদের নথিতে তাদের পরিচয় কেএনজি২৩ এবং সিসিবি৪। প্রথমটি চিতা নির্বার সন্তান, দ্বিতীয়টিকে আনা হয়েছে বটসোয়ানা থেকে। কুনো কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক সংবাদপত্রিকায় উঠে এসেছে তাদের সম্পর্কের গল্প। মজার বিষয়, দুজনের জীবনেই রয়েছে বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা। পরিবারের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া দুই চিতা শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে একে অপরকে।

একাকিত্ব থেকে সখ্য

গত মার্চে আঘাত পাওয়ার পর ভারতীয় চিতাটিকে মা ও ভাইবোনের কাছ থেকে সরিয়ে চিকিৎসার জন্য আলাদা রাখা হয়। অন্য দিকে, বটসোয়ানার চিতাটিও তখন নিজের দুই বোনের সঙ্গ হারিয়েছে। বেড়ার দুপাশে থেকেও তারা পরস্পরের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।

সুস্থ হয়ে কেএনজি২৩ পরিবারের সঙ্গে জঙ্গলে ফিরে গেলেও জুলাইয়ের শেষে ফের আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য ঘেরাটোপে ফিরতে হয় তাকে। আর তখনই দুটির আবার কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

এ বার সরিয়ে দেওয়া হল মাঝের বেড়া। খাবার সামনে পড়তেই বোঝা গেল, বন্ধুত্বে আপাতত ভাগ বসানোর প্রশ্ন নেই! দখল নিয়ে মারামারি নয়, বরং শান্তভাবে পাশাপাশি খাওয়া। ধীরে ধীরে শুরু হল একসঙ্গে চলাফেরা, শিকার, পাশাপাশি বসে থাকা। চোখের আড়াল হলেই একে অপরকে ডাকাডাকিও করে তারা। অন্য একটি চিতার দলের চ্যালেঞ্জের মুখেও দেখা গিয়েছে, দুই সঙ্গী পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়েছে।

বন্ধুত্ব, তবে শর্তসাপেক্ষ?

কুনোর অধিকর্তা উত্তমকুমার শর্মার মতে, এই ঘটনার বিশেষত্ব হল, দুই অসম্পর্কিত পুরুষ চিতার পরস্পরকে গ্রহণ করা। তাদের বয়সের ব্যবধানও প্রায় ছয় থেকে সাত মাস। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের অন্য পুরুষকে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই এই বন্ধন কতটা স্থায়ী হয়, সেদিকে নজর রাখছেন বনকর্মীরা।

অবশ্য পুরুষ চিতার দল বেঁধে থাকা একেবারে বিরল নয়। চিতা সংরক্ষণ তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, একই মায়ের পুরুষ সন্তানরা অনেক সময় সারা জীবন একসঙ্গে থাকে। এমন জোট শিকার ধরা এবং আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়।

পুনর্বাসনকেন্দ্রে বেড়ে ওঠা অনাথ চিতাদের মধ্যেও রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই জুটি তৈরি হতে পারে। মুক্তির পরেও সেই সম্পর্ক টিকে থাকার নজির রয়েছে। ফলে কুনোর এই বন্ধুত্বকে পৃথিবীতে প্রথম ঘটনা বলে দাবি করার সুযোগ নেই। তবে দুই ভিন্ন দেশ থেকে আসা, অসম্পর্কিত দুই পুরুষ চিতার এমন সখ্য নিঃসন্দেহে নজরকাড়া।

সঙ্গী মানেই বাঁচার সুবিধা

চিতার জীবনে স্বাধীন হয়ে ওঠার সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮ মাস বয়সে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তরুণ চিতাদের নিজেদের খাবার জোগাড় করতে শিখতে হয়। পুরুষ চিতাদের আবার নিজেদের এলাকা খুঁজতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতে পারে।

শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সামনে একা থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। সেই জায়গায় একজন সঙ্গী থাকা শুধু সুন্দর দৃশ্যের জন্ম দেয় না, বেঁচে থাকার বাস্তব সুবিধাও এনে দিতে পারে। একসঙ্গে শিকার, আত্মরক্ষা এবং এলাকা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

স্ত্রী চিতারা সাধারণত স্বাধীনভাবে বিচরণ করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ধরনের জোট তাদের সামাজিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ফলে চিতাদের দল গঠনের আচরণ বোঝা সংরক্ষণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।

আসল পরীক্ষা এখনও বাকি

তবে কুনোর এই জুটির সামনে বড় পরীক্ষা এখনও আসেনি। বর্তমানে তারা বিশাল ঘেরাটোপে রয়েছে; একসঙ্গে মুক্ত জঙ্গলে ছাড়া হয়নি। শর্মা জানিয়েছেন, চিতাবাঘ বা অন্য বড় শিকারি প্রাণীর মুখোমুখিও এখনও হয়নি তারা।

অরণ্যে ফিরলে খাবার, বিচরণক্ষেত্র এবং প্রজননের সঙ্গিনী নিয়ে প্রতিযোগিতার মুখে তাদের সম্পর্ক কতটা অটুট থাকে, সেটিই দেখার বিষয়। তাই ঘেরাটোপের বন্ধুত্বকে এখনই স্বাধীন অরণ্যজীবনের সাফল্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

ভারতে চিতা পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্পের লক্ষ্যও শুধু চিতার সংখ্যা বাড়ানো নয়। ভারতে জন্মানো চিতারা নিজেরা শিকার করবে, এলাকা গড়ে তুলবে, মুক্ত পরিবেশে প্রজনন করবে এবং তাদের শাবকেরাও টিকে থাকবে—সাফল্যের আসল মাপকাঠি সেটিই।

কুনোর দুই চিতা সেই দীর্ঘ যাত্রায় খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার একটি দরজা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সহযোগিতার বন্ধন তৈরি হতে পারে। এখন দেখার, ঘেরাটোপের নিরাপদ পরিসর পেরিয়ে অরণ্যের কঠিন বাস্তবতাতেও সেই বন্ধুত্ব তাদের পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যায় কি না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles