সুপ্রিম কোর্টে চারটি নতুন পদ: মামলার পাহাড়ের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন

যা জানা জরুরি
- সংসদে পাস হওয়া সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির সংখ্যা সংশোধনী আইন, ২০২৬ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতিসহ অনুমোদিত বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ করেছে।
- চারটি নতুন পদ বিচারাধীন মামলার চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
- কিন্তু কাদের ওই পদে আনা হবে, তা ঘিরে বিচারবিভাগের সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের পুরনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সংসদে পাস হওয়া সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির সংখ্যা সংশোধনী আইন, ২০২৬ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতিসহ অনুমোদিত বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ করেছে। চারটি নতুন পদ বিচারাধীন মামলার চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু কাদের ওই পদে আনা হবে, তা ঘিরে বিচারবিভাগের সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের পুরনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
আইন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠার পর নিয়োগ পাওয়া ২৮৯ জন বিচারপতির মধ্যে মাত্র ১২ জন মহিলা—প্রায় ৪.১৫ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে মাত্র ছ’জন কখনও বিচারপতি-নিয়োগের সুপারিশকারী কলেজিয়ামের সদস্য হয়েছেন। উচ্চ আদালতে বর্তমান ৮১৪ জন কর্মরত বিচারপতির মধ্যে মহিলা ১১৬ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৪.৩ শতাংশ।
২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে নিয়োগ পাওয়া ৮৪৯ জন বিচারপতির মধ্যে তফসিলি জাতির ৩৩ জন, তফসিলি জনজাতির ১৭ জন, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ১০৪ জন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪৬ জন ছিলেন। বিচারপতি নিয়োগে সংবিধান কোনও জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গভিত্তিক সংরক্ষণ নির্ধারণ করেনি। তবু সরকার নিয়মিতভাবে উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতিদের আরও বৈচিত্র্যময় নাম সুপারিশ করতে বলেছে।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর প্রধান যুক্তি অবশ্য মামলার বোঝা। উচ্চ আদালত ও জেলা আদালত মিলিয়ে প্রায় ৫.৬৮ কোটি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে জেলা আদালতেই প্রায় ৫.০৪ কোটি। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর জেলা বিচারবিভাগে ৪,৮৫৫টি পদ খালি ছিল। উচ্চ আদালতে ১,১২২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩০৮টি খালি—প্রায় ২৭.৫ শতাংশ।
ফলে সর্বোচ্চ আদালতে চারটি পদ যোগ করলেও বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক বিলম্ব দ্রুত কমবে না। সাধারণ নাগরিকের অধিকাংশ মামলা শুরু ও দীর্ঘদিন আটকে থাকে জেলা এবং উচ্চ আদালতে। বিচারপতি নিয়োগের পাশাপাশি আদালতকক্ষ, কর্মী, সরকারি আইনজীবী, ডিজিটাল নথি এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি আপিল কমানোর সংস্কার প্রয়োজন।
প্রাক্তন বিচারপতি মদন বি লোকুরের বক্তব্য, দেশে দক্ষ মহিলা ও বিভিন্ন সামাজিক পটভূমির যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই; অনুসন্ধানের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে। প্রাক্তন বিচারপতি কে চন্দ্রু সামাজিক ন্যায়কে নিয়োগে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে। আইনজীবী সৌরভ কিরপালের মতে, একই সামাজিক ও পেশাগত বৃত্ত থেকে অধিকাংশ বিচারপতি এলে আদালত একটি অভিজাত প্রতিধ্বনি-কক্ষে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বৈচিত্র্য মানে কোনও বিচারপতি কেবল নিজের সম্প্রদায়ের হয়ে রায় দেবেন, এমন নয়। যুক্তিটি হল, ভিন্ন জীবন-অভিজ্ঞতা যৌন নিপীড়ন, জাতিবৈষম্য, প্রজনন অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমকামিতার মতো মামলায় আলোচনার পরিসর বাড়াতে পারে। পাশাপাশি যোগ্যতা, সততা ও বিচারিক দক্ষতার মান অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য।
নতুন চারটি বিচারপতি পদ নিজে থেকেই কোনো সংস্কার নয়, এগুলো আসলে একটি সম্ভাবনার দরজা মাত্র। শুধু প্রচলিত জ্যেষ্ঠতা ও সীমিত পরিচিতির বৃত্ত থেকে নিয়োগ হলে আদালত বড় হবে, বহুমাত্রিক হবে না। আবার প্রতিনিধিত্বের আলোচনা যেন জেলা আদালতের বিপুল শূন্যপদ ও বিচারাধীন মামলার মূল সংকট আড়াল না করে। নিয়োগের মানদণ্ড ও সুপারিশের কারণ আরও স্বচ্ছ হলে যোগ্যতা বনাম বৈচিত্র্যের কৃত্রিম বিরোধও অনেকটাই কমতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



