য়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করে শেষ হয়েছে। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সৌদি আরবসহ পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশগুলি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে একই ভাষায় সম্মত হওয়ায় ঘোষণাটি ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ থামানো বা বাণিজ্যের বাধা কমানোর কোনও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা এই ঘোষণায় তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্মেলনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহশৃঙ্খলের ব্যাঘাত, জলবায়ু সংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে সদস্যদের যৌথ বক্তব্য প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সংগঠনটির কোনও একক বাজার, সামরিক কাঠামো বা কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নেই।

দিল্লির ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়া ও সুদানের সংঘাত, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, শুল্কবাধা এবং রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের কথা রয়েছে। সদস্যরা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃদেশীয় অর্থপ্রদান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। সংক্রামক রোগের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার প্রস্তাবও দিয়েছে ভারত।

সবচেয়ে কঠিন আলোচনা হয়েছে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলির অবস্থান নিয়ে। ভারতীয় কূটনীতিকেরা প্রায় একশো ঘণ্টা ধরে ভাষা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগ, ইরান ও আমিরশাহীর সর্বোচ্চ স্তরের যোগাযোগ এবং চিন, রাশিয়া, মিশর ও ব্রাজিলের উদ্যোগ ঐকমত্যে সাহায্য করেছে।

তবে ঘোষণার ভাষা আর মাঠের বাস্তবতা পৃথক। সদস্য দেশগুলির মধ্যে চিন-ভারত সীমান্তবিরোধ, ইরান-উপসাগরীয় উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ‘বহুমেরু বিশ্ব’ কথাটির অর্থও সবার কাছে একই নয়। কেউ পশ্চিমি প্রভাব কমাতে চায়, কেউ নতুন বিনিয়োগ ও বাজারের সুযোগ খোঁজে।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রস্তাবেও বাস্তব বাধা রয়েছে। বিনিময় হার, মুদ্রার সহজ রূপান্তর, বাণিজ্যঘাটতি এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি না মেটালে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত তৈরি হবে না। কাগজে সহযোগিতা এবং ব্যাঙ্কের দৈনন্দিন লেনদেনের মধ্যে বড় প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব।

ভারতের সাফল্য হল এত ভিন্ন দেশকে একই টেবিলে রেখে একটি গ্রহণযোগ্য পাঠ তৈরি করা। কিন্তু কূটনীতির পরবর্তী পরীক্ষা বিবৃতির পরে শুরু হয়। রোগ-সতর্কতা ব্যবস্থা কোথায় তৈরি হবে, অর্থ কে দেবে, স্থানীয় মুদ্রার লেনদেন কতটা বাড়বে এবং যুদ্ধ নিয়ে কোনও মধ্যস্থতা হবে কি না—এক বছরের মধ্যে এই ফলগুলি না-এলে দিল্লি ঘোষণা আর একটি সম্মেলন-নথিই হয়ে থাকবে।