দারার মুক্তির আবেদন ঝুলিয়ে রাখা চলবে না, ওড়িশাকে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের

যা জানা জরুরি
- নয়াদিল্লি, ৮ সেপ্টেম্বর: গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই নাবালক পুত্রকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দারা সিংহের আগাম মুক্তির আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে…
- মঙ্গলবার বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ জানায়, আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে।
- কিন্তু বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা চলবে না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নয়াদিল্লি, ৮ সেপ্টেম্বর: গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই নাবালক পুত্রকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দারা সিংহের আগাম মুক্তির আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে টালবাহানার জন্য ওড়িশা সরকারকে কড়া ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ জানায়, আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। কিন্তু বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা চলবে না।
শুনানির শুরুতে রাজ্য সরকারের আইনজীবী আরও চার সপ্তাহ সময় চান। তাঁর বক্তব্য ছিল, মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড অসুস্থ এবং সরকারের প্রয়োজনীয় নির্দেশও এখনও পাওয়া যায়নি। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করে বেঞ্চ মনে করিয়ে দেয়, আগের শুনানিতেও রাজ্য সময় চেয়েছিল। আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্তের সুযোগ দিতে বারবার শুনানি পিছিয়েছে আদালত। অথচ দু’বছরের বেশি সময় পেরিয়েও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন করেন, অকারণে কেন শুনানি পিছোনোর আবেদন করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য আবেদন খারিজ করতে চাইলে সেই সিদ্ধান্তই নিক; তারপর আদালত প্রয়োজনমতো বিষয়টি বিবেচনা করবে। সরকারের কাছ থেকে নির্দেশ সংগ্রহ করতে বলেন তিনি। পাশাপাশি সতর্ক করেন, সিদ্ধান্ত না হলে সংশ্লিষ্ট সচিবকে তলব করা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর।
দারার আবেদনে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই নোটিস জারি করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তার বক্তব্য, দীর্ঘ কারাবাসের পর আগাম মুক্তির আর্জি ওড়িশা সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটির বিবেচনা করা উচিত। গত অগস্টের নির্দেশে আদালত উল্লেখ করেছিল, আবেদনকারী ২৬ বছরের বেশি সময় বন্দি। সাজা পর্যালোচনা পর্ষদকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে মামলাটি একাধিকবার মুলতুবি করা হয়েছে।
আগের শুনানিতে রাজ্যের তরফে কারা ও সংশোধন পরিষেবা দফতরের একটি চিঠি পেশ করা হয়। তাতে জানানো হয়েছিল, কেন্দুঝর জেলা কারাগারের প্রতিবেদন এখনও আসেনি। আদালত তখন পর্ষদকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা জানাতে বলেছিল। কিন্তু সর্বশেষ শুনানিতেও সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পারেনি রাজ্য। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকার।
রাজ্যের তরফে আরও জানানো হয়েছে, কারাগারের প্রতিবেদন ছাড়াও উত্তরপ্রদেশ থেকে দারার অতীত সম্পর্কিত তথ্য যাচাইয়ের অপেক্ষা রয়েছে। কিন্তু আদালত মনে করিয়েছে, সাজা মকুবের আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সাজা পর্যালোচনা পর্ষদের। শুধু জেল কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন আসার অপেক্ষার কথা বলে সেই দায়িত্ব এড়ানো যায় না। বন্দির আবেদন বিবেচনায় এই বিলম্ব তার অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত বলে আদালত মন্তব্য করেছে।
দারা সিংহের আসল নাম রবীন্দ্র কুমার পাল। নিজের আবেদনে সে সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার যুক্তি তুলে ধরে অপেক্ষাকৃত উদার সাজা মকুব নীতির সুবিধা চেয়েছে। তার দাবি, আগাম মুক্তির জন্য একাধিকবার আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফলে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সে। অপরাধের জন্য অনুশোচনার কথাও আবেদনে জানিয়েছে দারা।
নিজের পক্ষে যুক্তি দিতে দারা রাজীব গান্ধী হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত এ জি পেরারিভালনের মুক্তির নজিরও তুলে ধরেছে। মুক্তি পেলে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সে। তবে এগুলি আবেদনকারীর বক্তব্য। আদালত এই শুনানিতে সেগুলি মেনে তার মুক্তি অনুমোদন করেনি। আপাতত বিচারপতিদের অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু, আবেদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং বারবার অতিরিক্ত সময় চাওয়া।
এই আবেদনের পটভূমিতে রয়েছে ১৯৯৯ সালের ২২ ও ২৩ জানুয়ারির মধ্যবর্তী রাতের হত্যাকাণ্ড। ওড়িশার কেন্দুঝর জেলার মনোহরপুর গ্রামে একটি শিবিরে যোগ দেওয়ার পরে গাড়ির মধ্যে ঘুমোচ্ছিলেন অস্ট্রেলীয় খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক গ্রাহাম স্টেইনস এবং তাঁর দুই ছেলে। ফিলিপের বয়স ছিল দশ, টিমোথির ছয়। দারার নেতৃত্বাধীন জনতা গাড়িটি ঘিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনজনই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
স্টেইনস দীর্ঘদিন ওড়িশায় কুষ্ঠরোগীদের সেবায় কাজ করেছিলেন। তাঁর এবং দুই শিশুর হত্যাকাণ্ড দেশে ও বিদেশে প্রবল আলোড়ন তোলে। ২০০৩ সালে বিচারিক আদালত দারা সিংহকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০০৫ সালে ওড়িশা হাই কোর্ট সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করে। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টও যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখে। মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন গৃহীত হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের পরে স্টেইনসের স্ত্রী গ্ল্যাডিস আরও কয়েক বছর ওড়িশায় থেকে স্বামীর শুরু করা সেবামূলক কাজ চালিয়ে যান। স্বামী ও দুই সন্তানের হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ক্ষমাও করেছিলেন তিনি। এই ব্যক্তিগত ক্ষমার ঘটনা মামলার ইতিহাসে আলোচিত হয়ে রয়েছে।
সাজা মকুবের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার অর্থ দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় মুছে যাওয়া নয়। এর মাধ্যমে প্রযোজ্য নীতি অনুযায়ী কারাবাসের মেয়াদে ছাড় দিয়ে আগাম মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কোনও বন্দি নির্দিষ্ট সময় জেলে কাটালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি পান না। সংশ্লিষ্ট নীতির শর্ত এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের উপর বিষয়টি নির্ভর করে। দারার ক্ষেত্রেও সেই সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।
চলতি বছরেও একাধিকবার এই আবেদনের নিষ্পত্তি পিছিয়েছে। মার্চে রাজ্য সরকার জানিয়েছিল, সাজা পর্যালোচনা পর্ষদ শীঘ্রই বিষয়টি পরীক্ষা করবে। এরপর মে মাসে নির্ধারিত পর্ষদের বৈঠক সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে পিছিয়ে যায়। ফলে একদিকে আদালতে পরবর্তী তারিখ পড়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। মঙ্গলবারের শুনানিতে সেই ধারাবাহিক বিলম্ব নিয়েই বিচারপতিরা কঠোর অবস্থান নেন।
আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে দারা সেই সিদ্ধান্তকে বিচারবিভাগীয় স্তরে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। আর আবেদন মঞ্জুর হলে সিদ্ধান্ত আদায়ের জন্য করা বর্তমান মামলার প্রয়োজন ফুরোবে। অর্থাৎ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্যও আগে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এখন নজর ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে। তার মধ্যে ওড়িশা সরকার কী সিদ্ধান্ত জানায়, এবং সিদ্ধান্ত না জানালে আদালত কাকে তলব করে, সেটাই দেখার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



