হিমালয়ের হুঁশিয়ারি

যা জানা জরুরি
- কাঠমান্ডু: নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,২৪৩।
- বিপর্যয়ের এক সপ্তাহ পরেও প্রায় ৪,৮৭৫ জনের কোনও সন্ধান নেই।
- অবিরাম বৃষ্টি, পাহাড়ধস এবং বিপুল কাদা-পাথরের স্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীরা এখনও ভোতে কোশী নদীর তীরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে পড়া মানুষদের খোঁজ…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কাঠমান্ডু: নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,২৪৩। বিপর্যয়ের এক সপ্তাহ পরেও প্রায় ৪,৮৭৫ জনের কোনও সন্ধান নেই। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। অবিরাম বৃষ্টি, পাহাড়ধস এবং বিপুল কাদা-পাথরের স্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীরা এখনও ভোতে কোশী নদীর তীরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে পড়া মানুষদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার সংসদে উপস্থিত হয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী দাবি করলেন, তাঁর দেশ বিশ্ব উষ্ণায়নের শিকার। শিল্পোন্নত দেশগুলির বিপুল কার্বন নিঃসরণের মাশুল দিতে হচ্ছে নেপালের মতো পাহাড়ি দেশগুলিকে। তাই পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’-এর দাবিও আরও জোরালো করবে কাঠমান্ডু।
গত চার মাসে মাত্র চতুর্থবার সংসদে হাজির হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ২৬ আগস্টের বিপর্যয় কোনও সাধারণ বন্যা ছিল না। এত দ্রুত এবং এত ভয়াবহ ভাবে পরিস্থিতি বদলে যাবে, তা আগে থেকে অনুমান করাও অত্যন্ত কঠিন ছিল।
বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের বিশাল একটি অংশ ভেঙে পড়ার পর বিপুল জলরাশি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ভোতে কোশী এবং সংলগ্ন নদীপথে নেমে আসে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একের পর এক জনপদ, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের বিপদ কত দ্রুত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পিছনে গোটা বিশ্বের অবদান রয়েছে। ফলে তার প্রভাব সামলানো এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দায়িত্বও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।”
বিপর্যয়ের পর সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ দ্রুত উদ্ধারকাজে নামে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আকাশ ও স্থলপথে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণকাজে মোতায়েন রয়েছেন ২১ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী।
তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়া কাদা ও বন্যার জলের কারণে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো নিশ্চিত প্রযুক্তি বর্তমানে নেই।
সরকারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে—৩৪৮টি। নওয়ালপরাসি পূর্বে ২১৮, নওয়ালপরাসি পশ্চিমে ২০৮, নুয়াকোটে ১৫৫ এবং রাসুয়ায় ১২৭টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। গোরখা, ধাদিং এবং তানাহু থেকেও বহু দেহ মিলেছে।
অন্য দিকে, তিব্বতের গিরং অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১। সেখানে এখনও ৫৪১ জন নিখোঁজ। নেপালে প্রায় ১০০ জন চিনা নাগরিকেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ বিজ্ঞানীরা। একটি নির্দিষ্ট হিমবাহধসের জন্য সরাসরি বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনও হাতে নেই। কিন্তু বৃহত্তর ছবিটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বিশ্বের বহু এলাকার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে হিমবাহ গলছে, চিরহিমায়িত মাটি আলগা হচ্ছে এবং পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর তার সঙ্গে বাড়ছে হিমবাহধস, পাথরধস, তুষারধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি।
একটি বিপর্যয় আবার অন্য বিপর্যয়কেও ডেকে আনতে পারে। পাহাড়ধস নদীর গতিপথ আটকে সাময়িক বাঁধ তৈরি করতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ জলস্রোত।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান করার কোনও প্রশ্নই নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিপর্যয়ের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণসামগ্রী নেওয়া হচ্ছে।
পরিচয়হীন মৃতদেহগুলির নমুনা সংগ্রহ করে আপাতত সমাধিস্থ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আত্মীয়েরা এলে ডিএনএ-সহ অন্যান্য তথ্যের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে দেহাবশেষ তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে নিখোঁজদের ফিরে আসার আশা যত ক্ষীণ হচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে বহু পরিবারের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই কেউ কেউ প্রতীকী শেষকৃত্য শুরু করেছেন। আর তার সঙ্গে সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—এই বিপজ্জনক নদী উপত্যকাগুলিতে আগের মতোই কি ফের বসতি, রাস্তা এবং জলবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে গেলেই হবে না। উন্নত সীমান্তবর্তী নজরদারি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কঠোর ভূমি-ব্যবহার নীতি এবং জলবায়ু ঝুঁকি মাথায় রেখে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা জরুরি। তা না হলে একই ধরনের বিপর্যয় ফের ফিরে আসতে পারে।
নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের একক ট্র্যাজেডি নয়। দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলের সামনে এটি এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা—পাহাড় বদলাচ্ছে, নদী বদলাচ্ছে, আর বদলে যাচ্ছে সেখানে বসবাসের নিরাপত্তার হিসাবও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



