বাংলাস্ফিয়ার: অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার উদ্যোগের পর এ বার ধর্মান্তকরণ এবং জমি কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণে পৃথক আইন আনার পরিকল্পনা করছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তকরণ বন্ধ করার পাশাপাশি জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে কোনও এলাকার জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা ঠেকাতেও কঠোর বিধান তৈরি করা হবে। তবে প্রস্তাবিত আইনগুলির খসড়া এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

শুভেন্দুর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করতেই এই আইনগুলি প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অনুপ্রবেশ, বেআইনি ধর্মান্তকরণ এবং পরিকল্পিত ভাবে জমি কেনার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে কয়েকটি অঞ্চলের জনবিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। বিজেপি সরকার সেই প্রবণতা বন্ধ করতে চায়।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ। সেই কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পরবর্তী অগ্রাধিকার হবে বেআইনি ধর্মান্তকরণ রোধ এবং জমি বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ। ধর্ম পরিবর্তন ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার হলেও ভয় দেখিয়ে, প্রতারণা করে, বিয়ের প্রলোভন দিয়ে অথবা আর্থিক সুযোগের বিনিময়ে কাউকে ধর্মান্তরিত করা যাবে না—প্রস্তাবিত আইনে এই পার্থক্য স্পষ্ট করা হতে পারে।

সরকারি সূত্রের বক্তব্য, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতের ধর্মান্তকরণবিরোধী আইনগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই রাজ্যগুলিতে বলপ্রয়োগ, প্রতারণা, প্রলোভন বা অসৎ উদ্দেশ্যে ধর্মান্তকরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত আইনেও একই ধরনের ব্যবস্থা থাকতে পারে। নাবালক, মহিলা, তফসিলি জাতি ও জনজাতির কাউকে বেআইনি ভাবে ধর্মান্তরিত করা হলে আরও কঠোর শাস্তির সংস্থান রাখা হতে পারে।

বিবাহের উদ্দেশ্যে ধর্ম পরিবর্তন কিংবা ধর্ম পরিবর্তনের জন্য বিবাহের ক্ষেত্রে আগাম প্রশাসনিক অনুমতি বা ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। অবশ্য আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে এই ধরনের বিধান আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ফলে খসড়া তৈরির সময় সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাই কোর্টের পূর্ববর্তী রায়গুলি বিবেচনায় রাখতে হবে।

জমি কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। শুভেন্দু এর আগে একাধিক বার ‘ল্যান্ড জিহাদ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে অভিযোগ করেছিলেন, সংগঠিত ভাবে জমি কিনে কোনও নির্দিষ্ট এলাকার জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও বিরোধীরা এই অভিযোগকে প্রমাণহীন এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কৌশল বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সরকার ঠিক কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তার বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে সীমান্তবর্তী ও জনজাতি-অধ্যুষিত এলাকায় জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই, ক্রেতার পরিচয় এবং অর্থের উৎস পরীক্ষা, বেআইনি দখল রোধ এবং একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জমি কেনার উপর নজরদারির মতো ব্যবস্থা বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রশাসনিক মহলের ইঙ্গিত। কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে জমি কেনা বা বিক্রি নিষিদ্ধ করা সাংবিধানিক ভাবে সম্ভব নয়। ফলে আইনটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাষায় তৈরি করে বেআইনি লেনদেন, বেনামি সম্পত্তি এবং জনবিন্যাস বদলের উদ্দেশ্যে সংগঠিত জমি কেনাকে লক্ষ্য করা হতে পারে।

শুভেন্দু সরকারের এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস, বাম ও কংগ্রেসের অভিযোগ, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার মতো প্রশ্ন থেকে নজর ঘোরাতে বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণের পথে হাঁটছে। ধর্মান্তকরণবিরোধী আইন ভিন্ন ধর্মের প্রাপ্তবয়স্কদের বিবাহ এবং সংখ্যালঘু ধর্মীয় সংগঠনগুলির কাজকর্মে হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।

বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। দলের বক্তব্য, স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন বা বৈধ জমি কেনাবেচায় কোনও বাধা দেওয়া হবে না। কেবল জবরদস্তি, প্রতারণা, বিদেশি অর্থের অপব্যবহার এবং পরিকল্পিত বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করাই সরকারের উদ্দেশ্য।

রাজ্যে ইতিমধ্যেই মসজিদ ও মন্দির থেকে নিয়মবহির্ভূত লাউডস্পিকার সরানোর অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। সেই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টে মামলাও হয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, লাউডস্পিকার অভিযান এবং এ বার ধর্মান্তকরণ ও জমি হস্তান্তর নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে শুভেন্দু সরকার যে তার ঘোষিত রাজনৈতিক ও আদর্শগত কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে, নতুন ঘোষণায় সেই বার্তাই আরও স্পষ্ট হল।