তৃতীয় কিস্তি

প্রস্তাবিত এফসিআরএ সংশোধনী বিল নিয়ে বিরোধিতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল—কোনও সম্পত্তি বিদেশি ও দেশীয়, দুই ধরনের অনুদান মিলিয়ে তৈরি হলেও প্রাথমিকভাবে সেটির পুরোটাই সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত হতে পারে।

অনেক স্বেচ্ছাসেবী, ধর্মীয় ও নাগরিক সংগঠন বছরের পর বছর ধরে দেশীয় দান এবং বিদেশি অনুদান একত্র করে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, অনাথাশ্রম ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, এই ধরনের সম্পত্তির কোনও অংশ বিদেশি অনুদানে তৈরি হয়ে থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ সম্পত্তিটিই মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংগঠন পরে আবেদন করে প্রমাণ করতে পারবে যে সম্পত্তিটির একটি নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত অংশ দেশীয় অর্থে তৈরি হয়েছিল। সেই অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ বিলে রাখা হয়েছে। কিন্তু তা হতে হবে “স্বতন্ত্র অথবা নির্ধারণযোগ্য” অংশ। অর্থাৎ দেশীয় অনুদানে তৈরি অংশটি হিসাবপত্র ও অন্যান্য নথির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

সমালোচকদের মতে, বহু পুরনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন হিসাব দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। একটি হাসপাতাল বা স্কুল ভবন হয়তো কয়েক দশক ধরে একাধিক পর্যায়ে তৈরি ও সম্প্রসারিত হয়েছে। কখনও বিদেশি অনুদান, কখনও দেশীয় দান, আবার কখনও স্থানীয় মানুষের শ্রম বা সামগ্রী ব্যবহৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সম্পত্তির কোন অংশ কোন অর্থে তৈরি, তা আলাদা করে নির্ধারণ করা বাস্তবে জটিল।

ফলে পুরো সম্পত্তি প্রথমে সরকারের মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করার বিধানটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি। তাদের আশঙ্কা, বিদেশি অনুদানের অংশ তুলনামূলকভাবে অল্প হলেও একটি গোটা শিক্ষা বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হতে পারে।

পূর্ববর্তী সময় থেকে আইন প্রয়োগের বিতর্ক

বিলের ১৬বি ধারা সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে। এই ধারায় নতুন ব্যবস্থাটি পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বর্তমান এফসিআরএ আইনের ১৫ ধারার অধীনে সংশোধনী কার্যকর হওয়ার আগেই যে বিদেশি অনুদান বা সম্পত্তি সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে, সেগুলিকে নতুন ‘তৃতীয়-ক’ অধ্যায়ের অধীনে সাময়িকভাবে ন্যস্ত বলে গণ্য করা হবে। সংশোধিত আইন কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই সেই সম্পত্তিগুলি নতুন ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।

এর অর্থ, আগে থেকে সরকারের হাতে ন্যস্ত সম্পত্তিগুলির পরিচালনা, ফেরত দেওয়া, অন্য কর্তৃপক্ষের হাতে স্থানান্তর কিংবা শেষ পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

এই পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রয়োগের প্রস্তাব বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ, ‘শংসাপত্রের অবসান’ সংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অতীতে যেসব সংগঠনের এফসিআরএ নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের সম্পত্তিও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে বিলে সরাসরি বলা হয়নি যে অতীতে নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়া প্রত্যেকটি সংগঠনের সম্পত্তি পূর্ববর্তী সময় থেকে সরকার অধিগ্রহণ করবে। তা সত্ত্বেও সমালোচকদের বক্তব্য, ১৪বি এবং ১৬এ ধারাকে একসঙ্গে প্রয়োগ করা হলে বিদেশি অনুদানে তৈরি পুরনো সম্পত্তিগুলিও নতুন ন্যস্তকরণ ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখানেই আইনি অনিশ্চয়তার জায়গাটি সবচেয়ে বড়। কোনও সংগঠনের শংসাপত্র অতীতে নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব, সময়মতো আবেদন না করা বা নবীকরণের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে অকার্যকর হয়ে থাকতে পারে। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পরে সেই অতীত ঘটনাকে ভিত্তি করে সম্পত্তির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তা ন্যায়সংগত হবে কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।

সরকারের যুক্তি

কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য কোনও সম্প্রদায় বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিশানা করা নয়। বিদেশি অর্থে তৈরি সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তি নিয়ে বর্তমান আইনে যে শূন্যতা রয়েছে, তা পূরণ করাই সরকারের লক্ষ্য।

কোনও সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল হলে, সংগঠনটি স্বেচ্ছায় শংসাপত্র সমর্পণ করলে অথবা তার আইনি অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেলে বিদেশি অনুদান ও সেই অর্থে তৈরি সম্পত্তির কী হবে—বর্তমান ব্যবস্থায় তা নিয়ে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে সরকারের বক্তব্য।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার অস্পষ্টতার কারণে একদিকে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অপব্যবহারের সুযোগও থেকে গিয়েছে। সেই কারণেই বিদেশি অনুদান ও তা দিয়ে তৈরি সম্পত্তি সাময়িক এবং স্থায়ীভাবে কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করা, তার তত্ত্বাবধান, পরিচালনা, স্থানান্তর ও নিষ্পত্তির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব আনা হয়েছে।

কিন্তু বিরোধী দল, গির্জা ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলির মতে, প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের নামে সরকারকে অত্যধিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত গোটা সম্পত্তি প্রথমে অধিগ্রহণ, নিবন্ধন নবীকরণ না হওয়াকে ‘অবসান’ হিসেবে গণ্য করা এবং পুরনো সম্পত্তির উপর নতুন আইন প্রয়োগের সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়ই তাদের প্রধান উদ্বেগ।

সরকার শেষ পর্যন্ত বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠালে এই ধারাগুলি আরও বিশদে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে। কমিটি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, আইনবিশেষজ্ঞ এবং সরকারি প্রতিনিধিদের বক্তব্য শুনে সংশোধনের সুপারিশ করতে পারবে। তবে সেই সুপারিশ গ্রহণ করা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।