বাংলাস্ফিয়ার: এফসিআরএ সংশোধনী বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর কথা সরকার যে বিবেচনা করছে, তার পিছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে কেরল ও তামিলনাড়ুর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছনোর বিজেপির যে উদ্যোগ চলছে, তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

কেরলে নিজেদের নির্বাচনী প্রভাব বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে বিজেপি। রাজ্যে ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য পেতে হলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একাংশের সমর্থন জরুরি বলে মনে করে দলটি। সেই কারণেই খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা ও বিভিন্ন গির্জার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরিকল্পিত উদ্যোগ চালাচ্ছে বিজেপি।

এমন পরিস্থিতিতে এফসিআরএ সংশোধনী বিল নিয়ে খ্রিস্টান সংগঠনগুলির মধ্যে তৈরি হওয়া আশঙ্কা বিজেপির রাজনৈতিক পরিকল্পনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে গির্জা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সমাজসেবামূলক সংগঠনের সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের অবস্থান নরম করার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। অদূর ভবিষ্যতে কেন্দ্র সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত বিল আনার পরিকল্পনা করছে। সেই বিল পাশ করাতে ডিএমকের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। দক্ষিণের রাজ্যগুলি আশঙ্কা করছে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাস হলে পরিবার পরিকল্পনায় সফল রাজ্যগুলি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ডিএমকের মতো দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী দলের সমর্থন কেন্দ্রের কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সংসদে এফসিআরএ সংশোধনী বিল পাশ করানোর মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের রয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারি সূত্রের দাবি, যথাযথ আলোচনা ছাড়া বিলটি পাশ করাতে চায় না কেন্দ্র। বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর পরিবর্তে বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাই বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পত্তি সরকারের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব

প্রস্তাবিত বিলে বর্তমান এফসিআরএ আইনে নতুন ‘তৃতীয়-ক’ অধ্যায় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কোনও সংগঠনের বিদেশি অনুদান গ্রহণের শংসাপত্র বাতিল, সমর্পিত বা অকার্যকর হয়ে গেলে সেই অনুদান এবং তা দিয়ে তৈরি সম্পত্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করা যাবে।

বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র হল এফসিআরএ শংসাপত্রের ‘অবসান’-এর প্রস্তাবিত ধারণা। নতুন ১৪বি ধারা অনুযায়ী, কোনও সংগঠন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শংসাপত্র নবীকরণের আবেদন না করলে, সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবীকরণ না হলে, শংসাপত্রটির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত ১৬এ ধারা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অব্যবহৃত বিদেশি অনুদান এবং সেই অর্থ দিয়ে তৈরি সম্পত্তি সাময়িকভাবে সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত হবে।

ওই কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দখল নিতে পারবে। জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে সংগঠনটির কাজকর্ম পরিচালনার দায়িত্বও নিতে পারবে। এই বিধান নিয়েই নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় সংগঠনগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আর্থিক অনিয়মের কোনও অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও কেবল শংসাপত্র নবীকরণ না হওয়ার কারণে একটি সংগঠন তার সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।

অবশ্য কোনও সংগঠন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন শংসাপত্র পেলে অথবা তার পুরনো শংসাপত্র নবীকৃত কিংবা পুনর্বহাল হলে, কর্তৃপক্ষকে তার সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে সম্পত্তিটি স্থায়ীভাবে ওই কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাবে।

স্থায়ীভাবে ন্যস্ত হওয়া সম্পত্তি কোনও কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারি মন্ত্রক, দপ্তর, সংস্থা অথবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। সরকার চাইলে সেই সম্পত্তি বিক্রিও করতে পারবে। বিক্রির অর্থ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অব্যবহৃত বিদেশি অনুদান ভারতের সঞ্চিত তহবিলে জমা পড়বে।

উপাসনাস্থলের ধর্মীয় চরিত্র রক্ষার বিধান

কোনও উপাসনাস্থল এই ব্যবস্থার আওতায় এলে তার ধর্মীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, উপাসনাস্থলটির পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এমন কোনও যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হচ্ছে, যারা তার মূল ধর্মীয় চরিত্র বজায় রাখবে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ধর্মীয় চরিত্র বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনও গির্জা বা অন্য উপাসনাস্থলের পরিচালনায় সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকারের উপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না।