ঝলমলের আড়ালে ডলি

যা জানা জরুরি
- “নিজেকে এত সস্তা দেখাতে অনেক টাকা খরচ হয়”—নিজের ঝলমলে চেহারা নিয়ে এমন আত্মবিদ্রূপ করতে পারতেন শুধু ডলি পার্টন।
- প্ল্যাটিনাম-রঙা চুল, ঝলমলে পোশাক, উঁচু হিল, অকপট হাসি আর অবিশ্বাস্য সংগীতপ্রতিভা—সব মিলিয়ে যেন এক চলমান চরিত্র।
- কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমান, তীক্ষ্ণ রসবোধসম্পন্ন, স্বাধীনচেতা এবং অসম্ভব উদার এক নারী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
“নিজেকে এত সস্তা দেখাতে অনেক টাকা খরচ হয়”—নিজের ঝলমলে চেহারা নিয়ে এমন আত্মবিদ্রূপ করতে পারতেন শুধু ডলি পার্টন। প্ল্যাটিনাম-রঙা চুল, ঝলমলে পোশাক, উঁচু হিল, অকপট হাসি আর অবিশ্বাস্য সংগীতপ্রতিভা—সব মিলিয়ে যেন এক চলমান চরিত্র। কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমান, তীক্ষ্ণ রসবোধসম্পন্ন, স্বাধীনচেতা এবং অসম্ভব উদার এক নারী।
সাত দশক ধরে দেশ-কাল-প্রজন্মের সীমা পেরিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখা সেই ‘কান্ট্রি সংগীতের রানি’ আর নেই। ২৫ আগস্ট ন্যাশভিলে ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন ডলি পার্টন। তাঁর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সংক্ষিপ্ত ক্যানসার-লড়াইয়ের পর প্রিয়জনদের ঘিরে শান্তিতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
তাঁর চলে যাওয়ায় শুধু একটি সংগীতজগতের অধ্যায় শেষ হল না। বিদায় নিলেন এমন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক, যিনি একই সঙ্গে গায়িকা, গীতিকার, অভিনেত্রী, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী—সব পরিচয়কে নিজের মতো করে বয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
দারিদ্র্য থেকে ঝলমলে মঞ্চে
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলির। স্মোকি মাউন্টেন অঞ্চলের লোকাস্ট রিজে ছোট কাঠের বাড়িতে দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা। বারো ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
বাবা রবার্ট লি পার্টন তামাকচাষ ও নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। মা অ্যাভি লি সংসার সামলাতেন। সংসারের অভাব মেটাতে ছেঁড়া কাপড় জুড়ে সন্তানদের পোশাক বানিয়ে দিতেন তিনি।
সেই পোশাকগুলির একটিই পরে একদিন স্কুলে সহপাঠীদের ঠাট্টার শিকার হয়েছিলেন ডলি। অপমানকে মনে গেঁথে রেখে সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর কালজয়ী গান ‘Coat of Many Colors’।
ডলির গল্পের সৌন্দর্য এখানেই—যে অভাব একসময় তাঁকে লজ্জা দিয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেটিকেই তিনি নিজের শিল্পের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
১৮-তেই ন্যাশভিল
পড়তে শেখার আগেই গান লিখতে শুরু করেছিলেন ডলি। স্কুল শেষ করে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাসে চেপে চলে যান ন্যাশভিলে—স্বপ্ন একটাই, গান লিখবেন এবং গান গাইবেন।
প্রথমে গীতিকার হিসেবে কাজ। পরে রেকর্ডিং চুক্তি। এরপর পোর্টার ওয়াগনারের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সহযোগী শিল্পী হিসেবে পরিচিতি।
কিন্তু পুরুষ-প্রধান কান্ট্রি সংগীতের দুনিয়ায় নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। ডলি শুধু অন্যের লেখা গান গাওয়া শিল্পী হয়ে থাকতে চাননি। নিজের গান, নিজের কণ্ঠ এবং নিজের পরিচয়—তিনটিই নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।
সেই জেদই তাঁকে একসময় নিয়ে যায় শীর্ষে।
‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’-এর গল্প
১৯৭৪ সালে পোর্টার ওয়াগনারের অনুষ্ঠান ছাড়ার সময় তাঁকে বিদায় জানিয়ে ডলি লিখেছিলেন ‘I Will Always Love You’।
গানটির পরের ইতিহাস সংগীতের অন্যতম বিখ্যাত অধ্যায়।
এলভিস প্রেসলি গানটি রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ম্যানেজমেন্ট গানটির প্রকাশনা-স্বত্বের অর্ধেক দাবি করায় ডলি রাজি হননি। পরে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে গানটি বিশ্বজোড়া সাফল্য পায় এবং ডলির লেখা গানটি হয়ে ওঠে সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় রেকর্ডিং।
ডলি পরে মজা করে বলেছিলেন, সেই গানের রয়্যালটি থেকে তিনি চাইলে এলভিসের গ্রেসল্যান্ডই কিনে নিতে পারতেন।
রসিকতা ছিল তাঁর স্বভাব, কিন্তু নিজের অধিকার নিয়ে আপস না করাও ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
‘জোলিন’ থেকে বিশ্বতারকা
‘Jolene’, ‘9 to 5’, ‘Here You Come Again’, ‘Islands in the Stream’—একটির পর একটি গান ডলিকে শুধু কান্ট্রি সংগীতের তারকা রাখেনি, তাঁকে বানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আইকন।
তিন হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন তিনি। পেয়েছেন ১১টি গ্র্যামি-সহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান। সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের জায়গা তৈরি করেন ‘9 to 5’, ‘Steel Magnolias’-এর মতো ছবিতে।
তাঁর সাফল্য অবশ্য শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না। ডলির বিশেষত্ব ছিল—তিনি কখনও নিজের শিকড়কে লুকোননি। পাহাড়ি টেনেসির দরিদ্র মেয়েটিই পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বিনোদন ব্যক্তিত্বে।
চুল, পোশাক আর তার আড়ালের মেধা
ডলি নিজের চেহারা নিয়ে কখনও অতিরিক্ত গম্ভীর ছিলেন না। বরং নিজের প্লাস্টিক সার্জারি, বড় চুল, ঝলমলে পোশাক কিংবা ‘গ্ল্যামারাস’ চেহারা নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা করতেন।
কিন্তু তাঁকে শুধু সেই চেহারায় আটকে রাখা ছিল তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচার।
তিনি ছিলেন অসাধারণ ব্যবসাবুদ্ধিসম্পন্ন। নিজের সংগীতের স্বত্ব, ব্র্যান্ড এবং ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে বরাবরই অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। একই সঙ্গে জানতেন, কী ভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হয় যাতে তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয় থাকে।
ডলির সবচেয়ে বড় প্রতিভা হয়তো শুধু গান লেখা নয়—নিজেকে কখনও অন্যের সংজ্ঞায় আটকে না রাখা।
তারকার চেয়ে বড় উত্তরাধিকার
ডলির সবচেয়ে গভীর প্রভাব অবশ্য সংগীতের বাইরেও।
তাঁর Imagination Library প্রকল্প বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের বিনামূল্যে বই পৌঁছে দিয়েছে। শিশুদের পড়ার অভ্যাস তৈরি এবং প্রাথমিক শিক্ষায় সহায়তার এই উদ্যোগ তাঁর অন্যতম বড় সামাজিক উত্তরাধিকার।
করোনার সময় মডার্নার কোভিড-১৯ টিকা গবেষণায় এক মিলিয়ন ডলার দান করেছিলেন ডলি। তাঁর সেই অবদান পরবর্তীকালে আরও আলোচনায় আসে।
অর্থাৎ, যে শিল্পী মঞ্চে ঝলমলে পোশাক পরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন, তিনিই আবার নেপথ্যে শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন, চিকিৎসা গবেষণায় অর্থ দিয়েছেন এবং নিজের সাফল্যের একটি বড় অংশ সমাজের জন্য ব্যবহার করেছেন।
ডলি শেষ হননি
ডলি পার্টনের মৃত্যুতে তাঁর কণ্ঠ থেমে গেল, কিন্তু তাঁর গল্প থামল না।
মৃত্যুর আগেও তিনি কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি ‘DOLLY: A True Original Musical’-এর ব্রডওয়ে প্রিভিউ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর উদ্বোধনী রাত নির্ধারিত হয়েছিল ২০২৭ সালের ১৯ জানুয়ারি—তাঁর ৮১তম জন্মদিনে।
হয়তো এটাই ডলির সবচেয়ে বড় পরিচয়। বয়স তাঁকে থামাতে পারেনি, খ্যাতি তাঁকে শিকড় ভুলিয়ে দেয়নি, আর ঝলমলে চেহারা তাঁর মেধাকে ঢেকে রাখতে পারেনি।
ডলি পার্টন ছিলেন একই সঙ্গে হাস্যরসের রানী, কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি, অসাধারণ গীতিকার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক বিরল তারকা।
ঝলমক ছিল তাঁর পোশাকে। আলোটা ছিল তাঁর ভেতরে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



