কসময় তাঁর মাথার দাম ছিল ছয় কোটি টাকা। মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে মহারাষ্ট্র–ছত্রিশগড় সীমান্তের বিস্তীর্ণ অরণ্যে সংগঠনের রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল নির্ধারণ করতেন তিনি। সেই মল্লোজুলা বেণুগোপাল রাও ওরফে ভূপতি এখন মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে গোন্ডওয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী। যে আদিবাসী মানুষের অধিকারের কথা বলে তিনি কয়েক দশক বন্দুক হাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সেই অধিকার আদায়ের কাজই এবার করবেন সংবিধান ও আইনের পথে।

গোন্ডওয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘একল’ কর্মসূচিতে তিন মাসের চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে ভূপতিকে। মাসিক সাম্মানিক ৩০ হাজার টাকা। কাজের মূল্যায়নের পরে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রশান্ত বোকারে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেই তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছে। গড়চিরোলির পুলিশ সুপার এম রমেশ তাঁর আবেদনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। ভূপতির দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসী সমাজের সমস্যার সঙ্গে নিবিড় পরিচয়কেই তাঁর বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

‘একল’ কর্মসূচির লক্ষ্য গড়চিরোলি জেলার ১,৪৪২টি গ্রামসভাকে শক্তিশালী করা। তফসিলি এলাকার পঞ্চায়েত সম্প্রসারণ আইন বা পেসা এবং বনাধিকার আইনে আদিবাসীদের যে অধিকার স্বীকৃত, তা কার্যকর করতে গ্রামসভাগুলিকে সাহায্য করে এই প্রকল্প। কাগজে অধিকার থাকলেও প্রয়োজনীয় নথি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আবেদনের ত্রুটির কারণে বহু আদিবাসী পরিবার বনজমির স্বীকৃতি পায় না। নতুন দায়িত্বে ভূপতি গ্রামবাসী, গ্রামসভা, জেলা পরিষদ ও প্রশাসনের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করবেন।

বনাধিকারের দাবিপত্র তৈরি, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, আবেদনের ভুল সংশোধন এবং তা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করবেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী গবেষণাকেন্দ্রের কাজে অংশ নেওয়া এবং সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও থাকবে তাঁর। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ ভূপতির পেসা ও বনাধিকার আইন সম্পর্কে জ্ঞান নিয়োগের সাক্ষাৎকারে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ভূপতির জীবন অবশ্য কোনও সাধারণ সমাজকর্মীর জীবন নয়। নিষিদ্ধ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও কৌশলবিদ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর কাজের এলাকা মহারাষ্ট্র, ছত্রিশগড় সগঢ়, তেলঙ্গানা ও ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি আরও ৬০ জন মাওবাদীর সঙ্গে গড়চিরোলিতে আত্মসমর্পণ করেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। আত্মসমর্পণের সময় ভূপতির হাতে বন্দুকের পরিবর্তে দেখা গিয়েছিল ভারতের সংবিধান।

তবে আত্মসমর্পণ মানেই যে নিজের সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়, তা একাধিক সাক্ষাৎকারে বুঝিয়েছেন ভূপতি। তাঁর বক্তব্য, ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সশস্ত্র সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে না-পারা, গণভিত্তির তুলনায় সামরিক অভিযানের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত মাওবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য, শোষণ এবং আদিবাসীদের বঞ্চনার মতো যে সমস্যাগুলি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলি এখনও মুছে যায়নি।

ভূপতির কথায়, সমাজে আমূল পরিবর্তন এবং আত্মসমর্পণকারীদের যথাযথ পুনর্বাসন না-হলে সংঘাতের কারণগুলি থেকে যাবে। তাঁর এই মন্তব্য সরকারি সাফল্যের প্রচারের মাঝেও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। কেবল নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে কিংবা কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আত্মসমর্পণ করিয়ে মাওবাদ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জমি, বনজ সম্পদ, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় শাসনে আদিবাসীদের প্রকৃত অধিকার নিশ্চিত না-হলে ক্ষোভ নতুন নামে ফিরে আসতে পারে।

ভূপতির নিয়োগ তাই একই সঙ্গে প্রতীকী এবং পরীক্ষামূলক। রাষ্ট্র দেখাতে চাইছে, অস্ত্র ত্যাগকারীদের সমাজের মূলস্রোতে সম্মানজনকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আবার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর অরণ্যজীবনের অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিক সম্পদে পরিণত করতে চাইছে। যে ব্যক্তি একদিন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তিনিই এখন সেই ব্যবস্থার আইন ব্যবহার করে আদিবাসীদের দাবি প্রতিষ্ঠা করবেন।

এই রূপান্তরের সাফল্য অবশ্য শুধু ভূপতির উপরে নির্ভর করবে না। তিনি তৈরি করে দেওয়া বনাধিকারের আবেদন প্রশাসন কত দ্রুত নিষ্পত্তি করে, গ্রামসভার সিদ্ধান্ত কতটা মানা হয় এবং পুনর্বাসন কতটা সম্মানজনক হয়—সেটিই আসল পরীক্ষা। বন্দুক থেকে গ্রামসভায় ভূপতির যাত্রা চমকপ্রদ; কিন্তু তা অর্থবহ হবে তখনই, যখন অরণ্যের মানুষের জীবনে আইনে লেখা অধিকার বাস্তব অধিকার হয়ে উঠবে।