‘পেপটাইড পার্টি’: দীর্ঘায়ুর নেশায় বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা

যা জানা জরুরি
- সঙ্গীত, খাবার, আড্ডা আর পরিচিতি তৈরির পাশাপাশি থাকছে ‘পেপটাইড টেস্টিং’—এমনই অভিনব আয়োজন নিয়ে ভারতের প্রথম ‘পেপটাইড পার্টি’র প্রচার হয়েছিল।
- বেঙ্গালুরুর কোরামঙ্গলায় ২৯ আগস্ট আমন্ত্রণভিত্তিক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আপসার্জ ল্যাবস এলএলপি।
- কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্ণাটকের খাদ্য নিরাপত্তা ও ওষুধ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে যায় সেই পার্টি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সঙ্গীত, খাবার, আড্ডা আর পরিচিতি তৈরির পাশাপাশি থাকছে ‘পেপটাইড টেস্টিং’—এমনই অভিনব আয়োজন নিয়ে ভারতের প্রথম ‘পেপটাইড পার্টি’র প্রচার হয়েছিল। বেঙ্গালুরুর কোরামঙ্গলায় ২৯ আগস্ট আমন্ত্রণভিত্তিক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আপসার্জ ল্যাবস এলএলপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্ণাটকের খাদ্য নিরাপত্তা ও ওষুধ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে যায় সেই পার্টি।
প্রশাসনের প্রশ্ন ছিল সরাসরি—কোন পেপটাইড ব্যবহার করা হবে, তার উপাদান ও উৎস কী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন রয়েছে কি না এবং কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হবে? অনুষ্ঠানের প্রচারে পেপটাইডজাত দ্রব্য প্রদর্শন, বিতরণ কিংবা অংশগ্রহণকারীদের তা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল বলে সন্দেহ করে কর্তৃপক্ষ। যদিও পরে আয়োজকদের দাবি, কোনও ইঞ্জেকশন বা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র প্রয়োজন এমন পণ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতাও করছেন বলে জানিয়েছেন।
পেপটাইড শব্দটি শুনলেই অবশ্য তাকে বিপজ্জনক বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। পেপটাইড হল অল্পসংখ্যক অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি ক্ষুদ্র শৃঙ্খল, যা মানবদেহে স্বাভাবিকভাবেই নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইনসুলিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, অক্সিটোসিন প্রসব ও আবেগগত বন্ধনে ভূমিকা রাখে, আর ভ্যাসোপ্রেসিন শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ পেপটাইড নিজে কোনও ক্ষতিকর বস্তু নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন অনুমোদন ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন যৌগকে ‘অ্যান্টি-এজিং’ বা ‘বডি অপ্টিমাইজেশন’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবশ্য বহু পেপটাইড-ভিত্তিক ওষুধের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত। ইনসুলিনের পাশাপাশি সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইডের মতো জিএলপি-১ গোত্রের ওষুধ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রা, কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে মানবদেহে গবেষণার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে এই ওষুধগুলি।
কিন্তু ‘পেপটাইড পার্টি’ বা বায়োহ্যাকিংয়ের দুনিয়ায় জনপ্রিয় বহু যৌগ সেই একই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নেই। বিপিসি-১৫৭, টিবি-৫০০, মোটস-সি, কেপিভি, এপিটালন, সেম্যাক্স, সিজেসি-১২৯৫ বা আইপামোরেলিনের মতো বিভিন্ন যৌগকে পেশির ক্ষত সারানো, চর্বি কমানো, ঘুমের উন্নতি, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা বার্ধক্য ধীর করার মতো নানা দাবির সঙ্গে বাজারজাত করা হচ্ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ এখনও কোষ বা প্রাণীর উপর গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ। মানুষের উপর বড় মাপের, নিয়ন্ত্রিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার তথ্য অপ্রতুল।
এই প্রবণতার পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে সিলিকন ভ্যালির ‘লংজেভিটি’ বা দীর্ঘায়ু আন্দোলনের। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ব্রায়ান জনসনের ‘ব্লুপ্রিন্ট’, বুলেটপ্রুফ কফির প্রতিষ্ঠাতা ডেভ অ্যাসপ্রের আত্মপরীক্ষা এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় পডকাস্টের মাধ্যমে শরীরকে প্রযুক্তির মতো ‘আপগ্রেড’ করার ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে। সমাজমাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে। অনুসারীদের অনেকেই নিজেদের ‘বায়োহ্যাকার’ বলে পরিচয় দেন। কোথাও কোথাও সেই সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে পেপটাইড ইঞ্জেকশন, মুখে খাওয়ার যৌগ এমনকি ‘পেপটাইড মকটেল’-ও।
এখানেই বিজ্ঞানের বড় আপত্তি। অধিকাংশ পেপটাইড মুখে খেলে পাকস্থলী ও অন্ত্রের অ্যাসিড এবং উৎসেচক সেগুলিকে ভেঙে ফেলতে পারে। ফলে সাধারণ পেপটাইডকে পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলেই শরীরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছে যাবে—এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে সেই বাধা এড়ানো সম্ভব হলেও তৈরি হয় অন্য ঝুঁকি। নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাব্যবস্থার বাইরে তৈরি পেপটাইডের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা, সঠিক মাত্রা এবং জীবাণুমুক্ততা নিশ্চিত করা কঠিন। বাড়িতে নিজের হাতে এমন উপাদান মিশিয়ে ইঞ্জেকশন নিলে সংক্রমণ, অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া, হরমোনের ভারসাম্যহানি কিংবা ভেজাল ও দূষিত উপাদানের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকে। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও বিপিসি-১৫৭ নিয়ে মানবদেহে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত সীমিত বলে সতর্ক করেছে। আইপামোরেলিনের শিরায় প্রয়োগ নিয়ে একটি গবেষণাতেও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।
আরও একটি তাত্ত্বিক উদ্বেগ রয়েছে। যে যৌগ শরীরের কোষের বৃদ্ধি বা দ্রুত টিস্যু পুনর্গঠনের সংকেত বাড়াতে পারে, তা আগে থেকে থাকা অস্বাভাবিক কোষের উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা দীর্ঘমেয়াদি মানব-গবেষণা ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এই অনিশ্চয়তাই বিশেষজ্ঞদের সতর্ক থাকার অন্যতম কারণ।
ভারতে আমেরিকার মতো স্বতন্ত্র ‘কম্পাউন্ডিং ফার্মেসি’ কাঠামো নেই। ফলে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কোনও পেপটাইড সরবরাহ বা ব্যবহারের বৈধতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ওষুধ ও নিয়ন্ত্রক বিধির উপর। বেঙ্গালুরুর ঘটনাতেও কর্ণাটক কর্তৃপক্ষ ১৯৪০ সালের ওষুধ ও প্রসাধনী আইন উল্লেখ করেছে।
সবশেষে মূল কথাটি সহজ। পেপটাইড কোনও ছদ্মবিজ্ঞান নয়—আধুনিক চিকিৎসার বহু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধই পেপটাইড-ভিত্তিক। কিন্তু একটি অনুমোদিত পেপটাইড ওষুধের সাফল্যকে বাজারে থাকা প্রতিটি পেপটাইডের নিরাপত্তার শংসাপত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। দীর্ঘায়ু, শরীর ‘আপগ্রেড’ করা কিংবা তারুণ্য ধরে রাখার আকর্ষণ যতই বাড়ুক, পার্টির আমেজে চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং বিপণনের সীমারেখা মুছে যাওয়াটাই এই নতুন প্রবণতার সবচেয়ে বড় বিপদ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



